বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা

বাবা হওয়ার ৪০ দিন পূর্ণ হলো, আলহামদুলিল্লাহ। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো হুট করে ঘটে কিন্তু এক একটি ঘটনা জীবনের পথকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়। নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়ায়। এই চ্যালেঞ্জকে সামলে নিতে না পারলে জীবন হয়ে উঠে বন্ধুর। মজার বিষয় হলো বিয়ের আগে অনেকেই বলবে বিয়ে করতে কিন্তু বিয়ের পর জীবন কেমন চলে সেটি খোঁজ নেয়ার মানুষদের খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি নেগেটিভ কারনে বলছিনা, জীবনটা এমনই। সব মানুষের জীবনেই সংগ্রাম করে চলতে হয়। জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোকে মানুষকে একাকী মোকাবেলা করেই পথ চলতে হয়। আপনার বেবি নেই অনেকেই বলবে আরে আপনার বেবি নেই। নানা প্রশ্ন। বেবি হওয়ার পর জীবনের সব বাস্তবতা যখন সামনে এসে দাঁড়াবে তখন একাকী চলতে হবে সব সামলে। সব বাবার জীবনই এমন।

বাবা হওয়ার অনুভূতি কি জিনিস তখনও হয়ত পুরোটা অনুভব করতে পারিনি। মায়ের গর্ভের বেবিটাকে ডাক দেয়া নড়াচড়া করলে একটু পুলকিত হওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। বেবির এক্সপেকটেড ডেলিভারি ডেট ছিলো ১৮ নভেম্বর। সবাই বলছিলো প্লাস/মাইনাস ২ সপ্তাহ। কিন্তু ১৮ নভেম্বর এর ৩-৪ দিন আগেও কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছিলো না। আমি বেবির মাকে বলছিলাম দেখো তোমার বেবি ঠিক সময় আসবে। সে একদিন বেশি বা কম থাকতে চায় না। আল্লাহ তার জন্য যেটা নির্ধারন করেছে সেদিনই চলে আসবে ইনশাল্লাহ। কোন লক্ষন ছাড়াই ১৭ নভেম্বর সকাল শুরু হলো। সন্ধার দিকে বেবির মায়ের পেইন। আমাদের কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। আমি একটু অন্যরকম মানসিকতার মানুষ। গিন্নিকে বলেছিলাম কাউকে বলার দরকার নেই অচথা সবাই টেনসন করবে। আমাদের হেলপ ও করতে পারবে না। শুধু ফোন দিয়ে আরো স্ট্রেস বাড়িয়ে দিবে। তারচেয়ে আল্লাহর রহমতে সব কিছু ভালোভাবে হোক তারপর জানাবো। সুতরাং দুজন মিলে আল্লার রহমতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রথমে ভাবছিলাম পেইন অন্য কিছুর। কিন্তু পেইনের ইনটেনসিটি বাড়া শুরু করলো। গিন্নি ডাঃ মানুষ বললাম কি করা যায়। দুজন মিলে পেইনকে অবজারভ করা শুরু করলাম যে ফ্রিকুয়েন্সি কেমন। যেহেতু অ্যাকটিভ লেবার না হলে এসব দেশে হসপিটালে ভর্তি করায় না এবং যেহেতু আমরা সিউর ছিলাম না। তাই ফ্রিকুয়েন্সি এবং ইনটেনসিটি নোট ডাইন করা শুরু করলাম। ১ ঘন্টা তারপর আরো এক ঘন্টা অবজারভ করার পর। সিউর হলাম যে লেবার পেইন। কিন্তু অপেক্ষা করতে লাগলাম দেখি কি করা যায়। ১৮ নভেম্বর রাত ২ টা। গিন্নির পেইন অনেক বেশি হতে লাগলো। অবশেষে হসপিটালে ফোন দিলাম। আমি কথা বলার পর গিন্নিকে দিলাম। যখন সে বললো ফ্রিকুয়েন্সি ১০ মিনিটের কম আবার বেবির ম্যুভমেন্ট কমে গেছে সুতরাং নার্স বললো রাতেই হসপিটালে যেতে চেকআপ করাবে। কোন প্রস্তুতি ছাড়াই হসপিটালে রওনা দিলাম। হসপিটালে গিয়ে চেকআপ করানোর পর বলা হলো হসপিটালে রাতটা থাকতে। ভাবলাম রাত শেষ হলেই বুঝি বাসা যেতে পারবো। এক কাপড়েই থেকে গেলাম পুরো রাত পার হয়ে সকাল হলো। ইউরোপের সিস্টেম হলো লেবার রুমে প্যারেন্টের থাকা আবশ্যকীয়। প্রতিটি মুহুর্ত এক একটি অভিজ্ঞতা। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকাল ১৮ই নভেম্বর। নতুন জীবনকে আলোর মুখ দেখাতে দেখছিলাম পেইন স্কেলের অসহায়ত্ব, আর ভাবছিলাম এজন্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মা দেরকে মর্যাদা দিয়েছেন। জন্মের আগ থেকে খাবারের অরুচি দিয়ে যার শুরু মানসিক পেইন থেকে শারীরিক পেইন। অতঃপর ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় আল্লাহ বাবুকে আলোর মুখ দেখালেন। বেচারা বের হয়ে এলেন আম্বিলিক্যাল কর্ডকে গলায় পেচিয়ে। নার্সদের চেহারায় উদ্বিগ্নতা ধরা পড়লো। বেবির নিশ্বাস নেই কয়েক সেকেন্ড। আমি কেমন জানি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিলাম কি করবো, একদিকে গিন্নিকে সাপোর্ট দেয়া অন্যদিকে বেবির এই অবস্থা। একজন নার্স বললো-“ইউ শুড সি হোয়াট উই আর ডুয়িং উইথ ইউর বেবি” দৌড়ে গেলাম। বেবিকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিলো ৩০ সেকেন্ডের মত তারপর সে কান্না শুরু করলো। অবশেষে স্ট্রেস কিছুটা কমলো। এরপর বেবিকে ওর মায়ের কাছে দিলে বেবি কিছুটা শান্ত হলো।
একদিন হাসপাতালে থাকার পর বাসায় ফিরলাম সব কিছু ঠিকঠাক দেখে। এখানে নিয়ম হলো একদিন পর একজন নার্স বাসায় এসে বেবিকে চেক করে যাবে সব ঠিক আছে কিনা। সে এসে চেপ করে দেখলো বেবির বিলিরুবিন অনেক বেশি। সুতরাং আবার হাসাপাতালে ছুটা। হাসপাতালে গিয়ে নিচ থেকে ফটোথেরাপি দিয়েও যখন বিলিরুবিন নিচে নামছিলোনা তখন উপর নিচ দু পাশ থেকেই ফটোথেরাপী দিয়ে ৭ দিন পর বিলিরুবিনের লেভেল রিস্ক লেভেল এর নিচে নামলো। এরপর বাসায় রওনা হলাম। বাবু ঠিক তার এক্সপেকটেড ডেইটের দিনেই তার নতুন পৃথিবীতে এসেছে আলহামদুলিল্লাহ। সেই ১৮ নভেম্বর থেকে জীবনের রুটিন পুরো চেঞ্জ হয়ে গেছে। প্রথম যে জিনিসটার কোন নিয়ম থাকেনা সেটি হলো ঘুম। আমি কি আরাম করে ঘুমাতাম সেটির আর কোন রুটিন থাকলোনা। বেবির মায়ের তো কোন কিছুরই রুটিন থাকলোনা। তবে মজার ব্যাপার হলো বাবুর কান্না শুনে খারাপ লাগেনা এটি হয়ত আল্লাহর রহমত সব বাবা মায়ের প্রতি, কোন বাবা মাই নিজের বেবির উপর বিরক্ত হয় না। কেমন একধরনের অটো দ্বায়িত্ব চলে আসে। এবং সব কিছুর উপর বেবিকে প্রাইওরিটি দিয়ে নিজেদের অন্যকাজ গুলোর প্রাইওরিটি ঠিক করা। এটাই হয়ত জীবন, এটাই জীবনের নিয়ম।
লিখার উদ্দেশ্য হলো, একজন বেবির জন্য মা বাবাকে কত কিছু সাক্রিফাইস করা লাগে তার শুরুটা হয়ত বুঝতে পেরেছি। যদিও আমি নিজের বাবা মাকে কখনই কষ্ট দেয় এমন কাজ করিনি। তারপর নিজেদের বেবি হওয়ার পর উপলব্ধি করতে পারলাম যে একজন মা কে কত কিছু সাক্রিফাইস করা লাগে, কত কষ্ট কত পেইন সহ্য করতে হয় শুধু একটি বেবিকে জন্ম দিতে এরপর জীবনের সব কিছুর থেকে কিছু না কিছু সাক্রিফাইস করে সন্তানকে বড় করে তোলে শুধুমাত্র সন্তানদের মুখে হাসি দেখার জন্য। একজন বাবাও অনেক সাক্রিফাইস করে যদিও মা দের তুলনায় অনেক কম। সেদিন আমার এক বন্ধু বলছিলো যে আস্তে আস্তে যত ত্যাগ করবি মায়া তত বাড়বে। হয়ত ব্যাপারটি এমনই ত্যাগের কারনে মায়া বাড়ে।

আমরা বড় হয়ে অনেকে হয়ত ভূলে যাই সেই শিশুকালের মা-বাবার ত্যাগের কথা। ভূলে যাই কত রাত ঘুমহীন কেটেছে শুধুমাত্র বেবিকে ঘুম পাড়ানোর জন্য। পৃথিবীর সব মা-বাবাই এই ত্যাগ গুলো করে। কিন্তু আমরা কজন সন্তানই বা পাড়ি সেই ত্যাগী মা-বাবাদের জন্য এক রাতের ঘুম নষ্ট করতে। নিজেদের ইনকাম থেকে মা-বাবাকে আগে প্রাইওরিটি দিতে। নিজেদের সূখের আগে মা-বাবার সূখকে প্রাইওরিটি দিতে।
আসুন যাদের মা-বাবা বেচে আছে, আমরা তাদের প্রতি আমাদের দ্বায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের কাজকে সহজ করে দিবেন, ইনশাল্লাহ।

সবাই আমাদের ছোট বাবুটার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যাতে তাকে মুত্তাক্বী হিসেবে কবুল করে। (আমীন)।

 

জীবন যেখানে যেমন

গতকাল রাত ১১ টার দিকে বাসায় ফিরছিলাম, বাস থেকে নামার পর একটু সামনে এগুতেই দেখি এক ৮০-৯০ বছরের বৃদ্ধা ওয়াকার নিয়ে হাটছে। যেটা দেখে মনটা খারাপ লাগছিলো মহিলাটির মাথা নুয়ে পড়েছিলো ঠিক হাটের কাছে পুরো বাকা হয়ে অত রাতে একলা রাস্তায় যাচ্ছে কোথায় যেন, ভাবছিলাম কি জীবন?? আজ আবার যখন বাসায় ফিরছিলাম রাত সাড়ে ১০ টা বাজে, ঠিক একই রাস্তায় আবার সেই বৃদ্ধা ঠিক একইভাবে শরীর পুরো ৯০ ডিগ্রি বেকে হেটে হেটে সামনে এগুচ্ছে। আজ দেখে অন্যরকম মনে হলো, যে জীবন এখানে এমনি, সবাই নিজের পায়ে চলাকেই হয়ত সন্মানজনক মনে করে। এখানেই সবাই জীবনকে এভাবেই মেনে নিয়েছে। তাই হয়ত বৃদ্ধাশ্রমে গিয়েও হয়ত অনেকের মনেহয় এটাই স্বাভাবিক। আমি আগে যে ল্যাবে থিসিস করছিলাম, ওখানে এক মিশরীয় ভদ্রলোক ছিলেন, উনার এক ছেলে। ছেলের যখন বিয়ে হলো তখন ছেলে আলাদা বাসায় উঠলো। ওকে জিজ্ঞেস করছিলাম, তোমার তো একটাই ছেলে বড় বাসায় একসাথে থাকলেই তো পারো, তোমাদের দেখাশোনার জন্য ভালো হতো।

ও তখন জবাব দিয়েছিলো, সে এখন বড় হয়েছে তার আলাদা বাসায় থাকাটাই স্বাভাবিক।

জীবন এক রকম হলেও, জীবনের উপাদান গুলো ভিন্ন। জীবনের রং, জীবনের এই ঘটনাগুলো এমনই কোথাও যেটি স্বাভাবিক ঠিক সেটি ই অন্য কোথাও অস্বাভাবিক। জীবনের সংজ্ঞাও তাই মানুষভেদে, শ্রেনী ভেদে ভিন্ন রকম।

জীবনের বাহ্যিকতা দেখে অনেক সময় মুগ্ধ হয়ে পড়ে, বাস্তবতা হলো জীবনের ভালো-মন্দ রূপ দুটি সব খানেই বিদ্যমান।

জীবন ধারনের উপকরন গুলোর সহজলভ্যতার হয়ত পার্থক্য থাকে, শারীরিক পুষ্টির অভাব জায়গা ভেদে ভিন্ন থাকতে পারে তবে মানসিক পুষ্টির অভাবটা কমবেশি সব খানেই বিদ্যমান।

আমরা শারীরিক পুষ্টির জন্য যুদ্ধ করলেও মানসিক পুষ্টির জন্য সামান্য কষ্ট করতেও প্রস্তুত নই, তাই সম্পদ ভরা এই দুনিয়ায় বড় বড় অট্টলিকা, বিশাল বিশাল বাগান তৈরী হলেও শান্তিময় সমাজ বিনির্মান তাই এখনো অধরা।

সুন্দর সমাজ, সুন্দর পৃথিবীর জন্য দরকার সুন্দর মানসিক সৌন্দর্য্যের মানুষ। সবার মন সৃষ্টিকর্তার দেয়া রংয়ে রঞ্জিত হোক এই কামনা করি।

সূখ কি পোষ্ট করা যায়??

ফেইসবুক হাজার মানুষের হাজার রকমের পোষ্ট। পোষ্টের ধরন যে কত প্রকার হতে পারে তার ইয়ত্তা নেই। কে কখন কোথায় গেলো, কখন বউয়ের সাথে কি খাইলো, কোথায় ঘুরতে গেলো এগুলোর ছবি। এগুলো দিয়ে কি সূখ প্রকাশ করা যায়?? নাকি ভালোবাসা প্রকাশ করা যায়??
ভালোবাসা কি এত মেকি? সূখ কি এতই সস্তা একটা ছবি দিয়ে সূখি থাকা প্রকাশ করা যায়?

মানুষের অন্তর ক্ষনিত আনন্দ ও ক্ষনিক ভালোলাগার বিষয়গুলোর প্রতি বেশি আসক্ত। নিজেদের ভালোথাকা মানুষকে বুঝিয়ে লাভ? 🙂 আর সেটি যদি স্বামী-বউ হয় তাহলে সেটি আরো বেশি চিন্তার বিষয়। কারন স্বামী এবং বউয়ের একান্ত কাটানো মানে ঘুরতে গিয়ে কাটানো সময়, একসাথে খাওয়ার সময়ের ছবি মানুষের সাথে শেয়ার করার অর্থ বুঝা খুব একটা কঠিন না। আপনি আমি যখন এগুলো শেয়ার দেই তখন এর মধ্যে মানুষকে দেখানোর একটি প্রচ্ছন্ন ভাব থাকে। দেখানো। এই দেখানো জিনিসটি আসলেই খুব একটা পজিটিভ না। কারন মানুষকে দেখানোর প্রবনতা আসলে এক ধরনের গরীব অন্তরের কাজ। যে অন্তরগুলো মানুষকে দেখিয়ে সূখ অনুভব করে। এগুলোর মধ্যে ভালাইও কিছু নেই। আগের যুগের মানুষের মধ্যে সূখ ছিলোনা? ছিলো সেখানে সম্পর্ক গুলো ছিলো আরো বেশি ভালো আরো বেশি মধুর। আগের সম্পর্ক গুলোর মধ্যে ছিলো একধরনের শ্রদ্ধা এবং খাটি ভালোবাসার বন্ধন। আর এখন সেটি এখন ক্ষনস্থায়ী এক ধরনের অনুভূতি।

এগুলো হওয়ার কারনই হলো মানুষের অন্তরের যে সৌন্দর্য্য তার অবনতির ফল। মানুষের অন্তর যখন স্রষ্টার জিকির থেকে দুরে অবস্থান করে তখন মানুষ নিজেদের ভালোলাগার জিনিসগুলো স্রস্টার সাথে শেয়ারের পরিবর্তে কমন মানুষের সাথে শেয়ার করে পরিতৃপ্তি খুজেফিরে। এগুলো হলো অতৃপ্ত আত্নার অনুভূতির প্রকাশ।

গবেষনা ল্যাবের পলিটিক্স

 

জীবন হলো এক অদ্ভূত জিনিস। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জটিলতায় পরিপূর্ণ। কি ব্যক্তি জীবন, কি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব জায়গায় পলিটক্স। কোথায় যেন শুনেছিলাম কেউ একজন বলেছিলো যে, তোমরা রাজনীতি করো কিন্তু পলিটিক্স করোনা। উনার মতে পলিটিক্স হলো নোংরা জিনিস। গ্রামীন পরিবেশে শৈশব কাটানো আমার জীবনটা ছিলো অনেক সহজ সরল। ছোট বেলায় যখন গ্রামে থাকতাম আমি খেলতে যেতাম সবার সাথে। আমার ঠিক উপরের বড় ভাইটি গ্রামীন কিছু খেলা ভালো খেলতে পারতো, যেমনঃ মার্বেল খেলা, দিয়াশলাইয়ের খোলস দিয়ে খেলা, তারপর পয়সা দিয়ে দান মারা 🙂 আমি এসব খুব একটা পারতাম না তবে আমার বড় ভাইয়ের জিনিস গুলো হাতে ধরে রাখতাম। এখন আর সেই ছোট নেই। দেশ ছেড়ে বহুদুরে।

ছোট বেলায় ভাবতাম হয় ডাক্তার হবো নয়ত ডক্টর হবো। আল্লাহ পরের আশাটা পুরন করার পথে। প্রায় ৫ বছর আছি গবেষনায়। ছা্ত্রহিসেবে আমি মধ্যবিত্ত 😛 তাই আমার মনের মত ল্যাবে কাজ করার সুযোগের চেষ্টা করতে পারিনি। একাডেমিক ছাত্র হিসেবে যেমন মধ্যবিত্ত অর্থনৈতিকভাবেও ছিলাম মধ্যবিত্ত পরিবারের একজন ছোট সদস্য। বিদেশে আসার কিছুদিন পরই চিন্তায় পরে গেলাম কি করা যায়, জীবনের সংগ্রামে পড়ে গেলাম। দেশে থাকলে হয়ত বিসিএস এ একটা পজিশন নিতাম। সুতরাং পিএইচডি পজিশনটা পাওয়া সোনর হরিনের মত হয়ে উঠলো। আল্লাহর রহমতে পেয়ে গেলাম। আলহামদুলিল্লাহ! ল্যাব সুপারভাইজর মানুষ হিসেবে ভালো।

তবে গবেষনার কাজ শুরু করার কিছুদিন পর কিছু কিছু বিষয় বুঝতে পারলাম, যে গবেষনায় ধরন আলাদা হলেও রাজনীতি আছে। আর একটি জিনিস বুঝলাম গবেষনা যেমন একটি প্যাশনের ব্যাপার তবে অনেক মানুষ আছে গবেষনা করে শখের বশে, অথবা কেউ করে ব্যবসা হিসেবে। নিজের পাবলিকেশনে দেখবেন আর একজন প্রথম অথার হয়ে বসে আছে। খুব পরিশ্রম করে কাজ করলেন প্রফেসর এসে বললো তাড়াতাড়ি ডিফেন্স দাও। ৪ বছরের কাজ ৩ বছরে শেষ করলাম, যাতে করে শেষ বছরটায় আরো বেশি কাজ করে আরো ভালো একটি পাবলিশন করা যায়, দেখা গেল প্রফেসর এসে বলছে জলদি ডিফেন্স দাও। মধ্যবি্ত্তের বিড়ম্বনা! 😛

জীবনের প্রতিটি জিনিসের মধ্যেই জটিলতা, পলিটিক্স আর বিড়ম্বনায় ভরপুর। সে তুলনায় আগের গ্রামীন জীবনকে আমার কাজে বেশি সরল মনেহয়। কারন সেখানকার মানুষগুলো অল্পতেই জীবনে সূখী হতে পারে। তবে ইদানিং শহুরে পলিটিক্সের ছোয়া গ্রামে লাগার কারনে গ্রামীন সমাজের সৌন্দর্য্য নষ্ট হয়ে গেছে।
তবে যাহাই ঘটুক জীবনকে উপভোগ করতে পারার মধ্যে প্রকৃত সূখ নিহিত। জীবনে পাওয়া না পাওয়ার হিসেব না করে শুধু সামনে এগুনোর মধ্যেই সফলতা। জীবনকে কারো সাথে তুলনা না করে নিজের জীবনকে নিজের মতে করে যাপন করার মধ্যে ই মূলতঃ প্রকৃত শান্তি। প্রত্যেকটি মানুষ আলাদা, প্রত্যেকটি মানুষের পেছনের ইতিহাস, পেছনের পরিবেশ আলাদা। সুতরাং প্রত্যেকটি মানুষের আউটকাম ও আলাদা হবে, সবার আউটকামের তাৎপর্য্যও আলাদা। তবে সমাজের সব মানুষের কাজের তাৎপর্য আছে তাই সবার কাজকে সবার সন্মান করা উচিত।

যেখানে যাই ঘটুক গবেষনার ল্যাব গুলো থেকে পলিটিক্স দুরে থাক এই কামনা করি। 😉

স্নো (তুষাঢ়) প্রেমিক এবং কাদা প্রেমিক

শৈশব কেটেছে গ্রামে, তাই গ্রাম আমার প্রানকে যেন উজ্জ্বিবীত করে তোলে। গ্রাম ছেড়ে শহরমূখী হতে হয়েছিলো যখন আমি ক্লাশ ফোরের ছাত্র। এরপর যখনই গ্রামে যেতাম গিয়ে প্রথমে আমাদের পুকুরপাড়ে যেতাম সেখানে দাড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত দেখলে মনের মধ্যে অন্যরকম এক শান্তি বয়ে আসত। এরপরই দেখতাম আমার লাগানো গাছ গুলো কেমন আছে, গাছগুলোকে এখনো অনেক মিস করি, দেশে গেলে গ্রামে যাই শুধুমাত্র গাছগুলোকে দেখার জন্য। সবুজ গাছ আমার প্রয়ি আর বাংলার আকাশের নীল। যখন ছোট ছিলাম বর্ষায় গ্রামে মাছ ধরতে যেতাম কাদা মাখা ক্ষেতে। মাঝে মাঝে জমি কর্দমাক্ত করে হা-ডু-ডু খেলতাম তার আনন্দ বলে শেষ করা যাবেনা। সেই সময়ের আনন্দগুলো ছিলো অনেক প্রানবন্ত। আর শহুরে আনন্দ হলো ভুতুরে।

সেই প্রানের গ্রাম সোনার দেশ ছেড়ে বহুদুরে আললান্টিকের পাড়ে, বাল্টিকের তীড়ে পরে আছি বেশ ক বছর। বিদেশে আসা আমার কাছে বাড়তি কোন আনন্দ বয়ে আনেনি কখনও। কেনো জানি আমার কাছে এটি বিশেষ কোনো ব্যাপার মনে হয় না। কারন সংক্ষিপ্ত এই জীবনে কোথাও স্থায়ী থাকার সুযোগ নেই, কারন আমাদের মৃত্যু অবধারিত। সুতরাং কোথায় আছি এটির চেয়ে কেমন আছি তা খুব বেশি বিবেচ্য। এই বিবেচনা যদি আমরা উল্টো করে করি তাহলেই আমরা আমাদের শান্ত মনকে না পাওয়ার বদনায় ভিজিয়ে দেই।

বিদেশে আসার পর তুষাঢ় পড়া জিনিসটি নিয়ে মাঝে মাঝে মনেহয় একটু লিখবো। প্রায়ই দেখা যায় বিদেশে বসবাসরত বাংগালীরা তুষাঢ়কেই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় বেশি পাওয়া মনে করে। স্নো পড়ার সাথে স্নোর সাথে নিজেদের বিভিন্ন আংগীকে ছবি মনেহয় স্নোর উপর হাটতে পারাতেই জীবনের চরম সার্থকতা। আসলে এগুলো মাঝে মাঝে আমাদের হীনমন্যতাই প্রকাশ করে। বিদেশে বসবাস করার সময় বিদেশের জিনিসগুলোকে আমরা যেভাবে গুরুত্বদিয়ে প্রকাশ করি অথচ তারচেয়ে কয়েক গুন সুন্দর জিনিস আমাদের বাংলাদেশের আনাচে কানাচে পড়ে থাকে। আমরা এগুলোতে নিজেদের সন্মান মনে করতে পারি না, আর একটি প্রধান কারন হলো আমরা নিজেদের সন্মান করতে শিখিনা। আমাদের মধ্যে আত্নশ্রদ্ধাবোধের চরম ঘাটতি। এরফলে আমাদের দেশের সুন্দর গ্রামগুলোর যে সৌন্দর্য্য সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা খুব বেশি বড় মনেকরি না। এর কারন হলো আমরা আমাদের যা আছে সেটিকে সন্মান করিনা। আর এটি করতে না পারা বা করতে না শেখার কারনেই আমরা অনেক সময় কারন ছাড়াই দুঃখী হয়ে যাই। আমারতো মনেহয় বাংলাদেশের মত সুন্দর এক দেশে জন্ম এর জন্যই সূখি হওয়া উচিত। বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থা নেই, বোমাবাজী নেই, হিন্দু-মুসলমান বা ধর্মে ধর্মে মারামারি নেই গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলো অল্পতে কিভাবে সুখী থাকা যায় তার জ্বলন্ত উদাহরন।

গ্রাম যখন মাঠভরে ধানক্ষেতে ভরে যায় তখন তার উপরে বাতাসের তরংগ অদ্ভূত সুন্দর এক পরিবেশের সৃষ্টি করে। পড়ন্ত বিকেলে সবুজ মাঠের উপর গ্রামীন ছেলেগুলোর খেলাধুলার মধ্যেও এক ধরনের প্রশান্তি। শেষ বিকেলে গ্রামমিন আকাসে বাড়ি ফেরা পাখীদের ঝাক আর কলরব এক স্বর্গীয় পরিবেশের তৈরী করে। আমরা অবশ্য এগুলো ভূলতে বসেছি এক অজানা চাওয়ার কারনে, আমরা ভাবি দেশান্তরী হলেই শান্তি অবশ্য কারনো আছে কারন মানুষ, সমাজ যখন অর্থকে বেশি বেশি সন্মান দেয়া শুরু করে, সমাজে যখন সন্মানের জায়গায় প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার ও প্রতিযোগিতা শুরু হয় তখন মানুষের মধ্যে টাকাওয়ালা হওয়ার বাসনা মানুষের মনের সৌন্দর্য্য কে নষ্ট করে দেয় ফলে মানসিক সৌন্দর্য্যহীন এক গ্রামীন সমাজ গড়ে উঠে। ফলে হারিয়ে যায় গ্রামীন সমাজের মূল ভিত্তি ভ্রাতৃত্ববোধ।

আমাদের গ্রামকে নিয়ে কাজ করতে হবে, বাংলাদেশের সমাজের মূল ভিত্তি যে গ্রামীন ট্রাডিশন সেগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের যে ঐতিহ্যগত গ্রাম সেটি ফিরে আসবে। হয়ত আবার কোন কবি কবিতা লিখবে “ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি”।

গ্রামীন সমাজের সৌন্দয্য ফিরিয়ে আনতে হলে, আইনের শাসনের পাশাপাশি গ্রামীন সমাজে বিনিয়োগের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হবে। গ্রামীন স্কুল কলেজগুলোতে গ্রামীন ট্রাডিশনগুলোর উপর আলোচনা, সংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সেই বোধগুলোকে ফিরিয়ে আনার বা ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই মানুষ একটুখানি শান্তি স্বস্তির জন্য গ্রামকেই বেছে নিবে।

বাংলাদেশ ভ্রমনঃ কিছু কথা এবং কিছু ব্যাথা

দেশে গিয়েছিলাম আমার ক্যামেরাটা সাথে নিয়ে, ইচ্ছে ছিলো দেশে গিয়ে বর্ষার কিছু রং এর ছবি তুলবো, ঘাস ফড়িং, প্রজাপতি আর দেশিয় পাখিদের বন্দী করে রাখবো ডিজিটাল ফ্রেমে। ইচ্ছে ছিলো গতবারের মত গ্রামের গিয়ে প্রকৃতির মাঝে অস্তগামী সূর্য্যের লাল ছবি তুলবো, গ্রামের দুরন্ত বালকের নির্মল হাসির ছবি তুলবো। ইচ্ছে ঈদটিকে উদযাপন করবো সবার সাথে সেটিও হয়নি।

ইচ্ছে ছিলো অনেক কিছুর। তবে ইচ্ছেগুলো খুব বেশি দামী ছিলো না। কিন্তু কোথায় যেন বদলে গেছে আমার ফেলে আসা সময়গুলো, বদলে গেছে আমার সেই গ্রামের মানুষগুলো, হয়ত বদলে গেছে প্রকৃতি, হয়ত পরিবেশ প্রকৃতি আমাদের আর আপন ভাবতে পারছেনা। কোথায় যেন অসামন্জস্যতা, কোথায় যেন অমিল।

তবে বাসার বেডে শুয়ে জানালায় উকি দেয়া আকাশ দেখেছিলাম, মনে হয়েছিলো আকাশের রংটা ঠিকই আছে, দেখেছিলাম বাসার আংগিনায় শালিক পাখির মুখ থেকে আহার গুলো নেয়ার জন্য দৃশ্য, বাচ্চা গুলোর আদুরে চিতকার। ছবি তুলতে গিয়ে পারিনি তারা এসেছিলো ক্ষনিকের জন্য।

ফিরে আসার শেষ কয়দিন আকাশটা কেমনজানি আপন মনে হয়েছিলো। আকাশের নীল রংটা কাছে ডাকছিলো সাথে গাছের সবুজ।

তবে মানুষগুলোর রং বদলে গেছে। আগের সাদা মানুষগুলো জীবনের জটিল হিসেবে কুটিল হয়ে উঠেছে। মানুষ নামী প্রানীগুলো এখন আর সেই সাদা মনের মানুষ নেই সবাই কেমন জানি মানুষের মুখোশে বন্য হায়েনার মত হয়ে উঠছে, কিসের জেন নেশা, মনে হয়েছে পুরো দেশটা একটি জংগল হয়ে উঠেছে যেখানে প্রতিহিংসা আর প্রতিশোধের তীর‍্র আকাংখা হয়ে উঠেছে মূখ্য। বিত্তহীন মানুষগুলোর চিত্ত কেমন জানি কলুষিত হয়ে উঠেছে, মানুষগুলো বিত্তের তীব্র মোহে কেমন জানি বদলে গেছে, সেখানে চেষ্টা করে বড় হওয়ার চেয়ে মানুষকে ঠকিয়ে বড় হওয়ার আকাংখাই মনেহয় মূখ্য হয়ে উঠেছে, সততা আর ন্যায়ের জায়গায় এখন অসততাই সমাজের নীতি হয়ে দাড়িয়েছে। সেখানে কেউ নীরব থেকে অন্যায়ের জয়গান গাইছে আর কেউ ঘটনায় জড়িয়ে ক্ষনিকের আদিম উল্লাসে মেতে উঠছে।

দেশে গিয়ে দেখলাম শুধুমাত্র মতাদর্শের পার্থক্যের কারনে একজন মানুষকে কিভাবে বার বার জেলে যেতে হয়। দেখলাম স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে কিভাবে মানুষকে নিজের বাড়ি ছেড়ে রাতের পর রাত পালিয়ে থাকতে হয়। দেখলাম কিভাবে মানুষের মুখোশধারী সমাজপতিরা তথাকথিত ভালো মানুষগুলো সেগুলোকে উতসাহ দিয়ে নিজেদের পশুত্বের প্রকাশ করছে, দেখলাম কিভাবে মানুষ ন্যায়কে সুকৌশলে এড়িয়ে যায়।

সৈয়দপুরের হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম ভাই, যখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম তখন থেকে মানুষটাকে জানি। কখনোই কারো সাথে ঝগড়া বা রাগ করে কথা বলেছে শুনিনি। শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারনে বেচারা নিরিহ মানুষটাকে কয়েকবার ধরে নিয়ে চোর-পুলিশ খেলা খেলছে আমাদের পুলিশ ভাইয়েরা। ধরে নিয়ে মাইর, টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়া, রাজনীতি যাতে না করে সেজন্য শারীরিক অত্যাচার করা বেশি টাকা পাইলে ছেড়ে দেয়া, এসবের মধ্যে বেচারার জীবন চলছে। আসার আগে কথা হলো বললেন আবার অন্য এলাকার একটা মামলা দিয়েছে, হয়ত আবার কোনদিন পুলিশ ধরবে, মারবে। আমরা সমাজের ভালোমানুষ গুলো মনের বিকৃত আনন্দে পুলকিত হবো, প্রতিপক্ষের একজন মাইর খাচ্ছে শুনে আমরা আদিম বিকৃত আনন্দে উল্লাস করবো।

এভাবে আর কতদিন?? আমরা কি পারি না মানুষ হতে?? মানুষের মতামতকে শ্রদ্ধা করতে?? আমরা কি পারিনা মানুষকে ভালোবাসতে??

হয়ত অনেকেই বলবে দেশে এমন অবস্থা নেই, তাদের প্রতি অনুরোধ একবার নিজেকে মানুষ ভেবে চারপাশে তাকান দেখবেন আমরা মনুষ্যত্বকে ধ্বংস করছি, আমরা সমাজের অপরাজনীতির ফাদে বন্দী হয়ে মানবতার অপমান করছি, দেখবেন সমাজের ভালো ছেলেটি এখন পুলিশের ভয়ে পালিয়ে বেড়ায়, চোর-বদমাশ-গুন্ডা-নেশাখোর রা এখন নিশ্চিন্তে ঘুমায়। আর সেই ঘুমের ব্যবস্থা আমরাই করে দিয়েছি। কারন আমরা অপরাজনীতির গড়া সমাজনীতির কাছে নিজেদের স্বত্তাকে বিক্রি করে দিয়েছি নিছক নোংরা রাজনৈতিক স্বার্থে।

প্রত্যাশা একটাই, সবাই সবাইকে ভালোবাসুক, নিজ ভূমে সবাই নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারুক, বাংলাদেশের মানুষগুলোর মধ্যে আগের সেই শ্রদ্ধাবোধ ফিরে আসুক। পুলিশগুলো সমাজের ভালো মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিখুক।

“আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
আমরা আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান
মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম

হিন্দু বাড়িতে যাত্রা গান হইত
নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম
জারি গান, বাউল গান
আনন্দের তুফান
গাইয়া সারি গান নৌকা দৌড়াইতাম

বর্ষা যখন হইত,
গাজির গান আইত,
রংগে ঢংগে গাইত
আনন্দ পাইতাম ।।
কে হবে মেম্বার,
কে বা গ্রাম সরকার
আমরা কি তার খবরও লইতাম ।।
হায়রে আমরা কি তার খবরও লইতাম
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ।।

বিবাদ ঘটিলে
পঞ্চায়েতের বলে
গরীব কাংগালে
বিচার পাইতাম ।।
মানুষ ছিল সরল
ছিল ধর্ম বল ।।
এখন সবাই পাগল
বড়লোক হইতাম ।।

আগে কি………

করি ভাবনা
সেই দিন আর পাব নাহ
ছিল বাসনা সুখি হইতাম ।।
দিন হতে দিন
আসে যে কঠিন
করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম….”

সবাই ভালো থাকুক!

জীবন ডায়েরী-০৩

২০০৮ সাল, অ্যাপলিকেশন করলাম সুইডেন এ। কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভালো বা মন্দ এসব বাচ-বিচার না করেই Skövde তে এক বন্ধু/সহপাঠী ২০০৭ এ চলে গিয়েছিলো সেখানে ভর্তির জন্য দরখাস্ত করলাম। চান্স পেয়ে গেলাম, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে সুইডেনে চেল আসলাম, ১ সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে। আমি দেখতে ইয়ং ছেলেদের মতই ছিলাম। ইত্তেহাদ এয়ারওয়েজ এর এক বিমানে রওনা দিলাম আর এক ছোটো ভাইয়ের সাথে (সে এক বছর জুনিয়র)। বিমান বন্দরে নেমে যখন সুইডেনগামী বিমানে উঠতে গেলাম কাউকে আটকালোনা আমারে দাড় করালো ভর্তির পেপারসগুলো সে দেখতে চাইলো। আমার ভর্তির কাগজগুলো ছিলো মেইন লাগেইজ এর সাথে হ্যান্ডব্যাগে নিতে ভূলে গিয়েছিলাম। যাই হোক অবশেষে রক্ষা হলো। সুইডেনে নেমেই দেখি ইয়া বড় বড় সব সিকিউরিটি গার্ড দাড়িয়ে আছে। এখানেও আমারে আটকায় জিগ্গেস করা শুরু করলো। তুমি কি করতে এসেছো?? ব্যবসা?? আমি বললাম যে পড়ার জন্য এসেছি। যা হোক সব কাজ শেষ করে রওনা দিলাম বন্ধু মামুনের বাসায়। সে একটু ফাস্ট। দু-টিনটি বড় বর ব্যাগ নিয়ে সে দৌড়াইতে বললো, বললো সুইডেনে সবাই নাকি দৌড়ের উপর থাকে। নতুন অভিগ্গতা হলো। একদিন তার বাসায় থেকে রওনা দিলাম Skövde এর দিকে। ওখানে গিয়ে ভালৈ লাগলো কিছুদিন পর আর বাকি বন্ধুরা চলে আসলো। একটি ব্যাপার উল্লেখ করা জরূরী যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমরাই প্রথম যারা একসাথে ৮ জন একই ডিপার্টমেন্ট থেকে পড়ার উদ্দেশ্য বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলো। সুইডেনে এ এসেই কিভাবে টাকা সেইভ করে চলা যায় সবার মাথায় একই চিন্তা শুরু হলো, কাজের সন্ধান ও শুরু হয়ে গেলো। শেষমেশ একটি পেপার জব মানে নিউজপেপার ডিস্ট্রিবিউটরের জব পেয়ে গেলাম, দুজন মিলে করতাম। সবাই মিলে একসাথে থাকায় সময় গুলো দ্রুত কেটে গেলো। আমরা বায়োমেডিসিন প্রোগ্রামে এসেছিলাম। থিওরী শেষ করে থিসিস করার উদ্দেশ্য রাজধানী শহর (স্টকহোল্ম) এ রওনা দিলাম। এসে এক বাসায় ৬ জন বন্ধু একসাথে উঠলাম। জবের জন্য ছুটাছুটি করা, থিসিসের জন্য লিখালেখি আর সপ্তাহান্তে বাসায় বাংলা পার্টির আয়োজন করে সময়গুলো কাটছিলো। দু-এক বন্ধু চলার মত জব পেয়ে গেলো। আমি পেপার বিলি করে থিসিসের জন্য লিখালেখি করতে করতে থিসিস পেয়ে গেলাম। থিসিস শেষ করতে গিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হলাম। এক বাংলা গ্রোসারী দোকানে পার্ট টাইম জব করতাম আর থিসিস করতাম এভাবে একদিন থিসিস শেষ হয়ে গেলো। এরপর শুরু হলো আসল সমস্যা। জীবনের কিছু কঠিন সময়। কি করব?? কোন ওড জব করবো, পিএইচডি পজিশনের জন্য অপেক্ষা করব নাকি দেশে ব্যাক করে বিসিএস ট্রাই করবো। কারন বিসিএসের চিন্তা সব সময় মাথায় কাজ করত। কিছু বন্ধু জবও পেয়ে গেলো। মানুষকে অনুরোধ করা বা মানুষের পেছনে জবের জন্য তেল দেয়া আমার অভ্যসে ছিলোনা। এখানেও জীবনের কিছু বাস্তব অভিগ্গতার সম্মুখীন হলাম। এক বন্ধু মুটামুটি ভালো বেতনের জব পেয়ে গিয়ে একটা পজিশন তৈরী করে নিলো। তাকে জবের জন্য বলেও জব পাচ্ছিলাম না। যদিও সে আমার বন্ধু ছিলো সে অবশ্য অনেক মানুষকে জব দিয়েছিলো। কিন্তু আমার ব্যাপারে কেনো জানি একটু অন্যরকম ছিলো হয়ত ইসলামী সংগঠন করতাম তাই। অবশেষে আর এক বন্ধুর অনুরোধে সে ৩ ঘন্টার একটি কাজ দিলো। ৩ মাস কাজ করলাম করার পর আমার কাজ আরো বেশি পাওয়ার কথা এবং আমার নিজের নামে কাজ হওয়ার কথা। বন্ধু টি অন্য ছেলেদের কাজে সহায়তা করলো আমাকে বললো তুই অন্য জব দেখ, সে একথাও বললো তোর সুইডেনে আসাই ঠিক হয়নি দেশে থাকলে ই পারতি।
আমি আল্লাহর উপর ভরসা করে পরিকল্পনা পরিবর্তন করলাম। উপশালা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেলাম এ্যাপ্লাইড বায়োটেকনোলগিতে, পাশাপাশি দীপন ভাইয়ের সহায়তায় একটি রাতের পেপার ডিস্ট্রিবিউটরের জব পেয়ে গেলাম। পরিকল্পনা ছিলো বায়োটেক এ মাস্টার্স করবো পাশাপাশি পিএইচডির জন্য অ্যাপ্লিকেশন করবো আর বিসিএসের জন্য পড়ব। রাতের নিউজপেপার ডিস্ট্রিবিউটরের জব জীবনে চিন্তা করিনি আমি বাড়ির ছোট ছেলে ছিলাম। ছাত্রও খুব খারাপ ছিলাম না, যাই হোক আমি সব কিছু মেনে নিয়ে সামনে চলতে অভ্যস্ত ছিলাম এবং রিজিকের জন্য আল্লাহর উপর সব সময় নির্ভরশীল ছিলাম।
দু-রাত পেপার দিয়ে অনেক কষ্ট অনুভব করছিলাম। তৃতীয়দিন গেলাম না অসুস্থতার কথা বলে। ইতোমধ্যে আমার থিসিস সুপারভাইজরকে নিয়মিত মেইল করতাম পিএইচডি পজিশনের জন্য। অবশেষে হঠাত করে তার একটি মেইল পেলাম যে আমি যদি কমিটেড হই, এবং পিএইচডি করতে চাই তাহলে তাকে যেন জানাই। তাকে জানালাম যে আমি অবশ্যই পিএইচডি করতে চাই।

সে আমাকে একটি লিংক দিয়ে অ্যাপ্লাই করতে বললো। বললো যে তারা ড্রাগ স্ক্রিনিংয়ের কাজ করছে ৬ মাসের জন্য নিবে তারপর কাজ দেখে এক্সটেন্ড করবে। দরখাস্ত করলাম। এদিকে বায়োটেক এর ক্লাশ নিয়মিত শুরু করলাম। আমি থিসিস শেষ করেছিলাম জুলাই ২০১০।
জানয়ারী ২০১১ এ সুপারভাইজরের দেয়া লিংকে অ্যাপ্লাই করেছিলাম। হঠাত সুপারভাইজের মেইল যে তুমি কি দরখাস্ত করেছিলা?? বললাম যে জ্বি করেছিলাম, সে বললো তুমি আরো একটু স্মার্ট হতে পারতে তাদের ফোন দিতে পারতে। সে বললো ওরা নাকি একজনকে নিয়ে নিয়েছে। ভাবলাম রিজিক এ নেই আমি প্রচন্ড লাজুক আর আত্নসম্মানসম্পন্ন মানুষ। গায়ে পরে কাউকে অনুরোধ করার অভ্যস কোনদিনও ছিলো না।

আমি স্টকহোল্ম থেকে উপশালা যাতায়াত করতাম। স্টকহোল্মে রাতে পেপার জব দিতাম আর দিনের বেলা উপশালা গিয়ে ক্লাশ করছিলাম। ৩০ জানুয়ারী ২০১১ ক্লাশ শেষে উপশালা র ইকবাল ভাইয়ের রুমে গেলাম দেখা করতে ভাবলাম ই-মেইলটা চেক করি, ই-মেইল চেক করে দকেহি একটি মেসেজ যে আমি ভাইভা দিতে পারবো কিনা। রিপ্লাই দিলাম যে আমি আজেকই ভাইভা দিতে পারবো। পরের দিন ভাইভা দিয়ে তারপর দিন থেকে কাজ শুরু করলাম। এভাবে দু-বছর রেসার্স এ্যাসিসটেন্ট হিসেবে কাজ করলাম। এর মাঝে অনেকবার ইচ্ছে হচ্ছিলো বিসিএস দিয়ে আসি। শেষ যখন ২০১২ এর দিকে মুটামুটি শিউর হলাম যে পিএইচডি রেজিস্ট্রেশন হয়ে যাবে তখন ভাবলাম দু-নৌকায় পা না দেই। তখন সিন্ধান্ত নিলাম যে পিএইচডি টা আগে শেষ করি যেহেতু সুইডেনে এসেছিলাম ডিগ্রি নিতে ডিগ্রি নেই।

পিএইচডি রেজিস্ট্রেশনের আগে অবশ্য আমাকে জিগ্গেস করা হয়েছিলো যে আমি সুইডেনের পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট পারমিট নিতে চাই নাকি পিএইচডি নিতে চাই। চিন্তা করলাম যে যেহেতু পিএইচডি নিতে এসেছি এবং ডিগ্রি থাকলে পৃথিবীতা আরো ওপেন হয়ে যাবে, আবার সুইডেনে থেকে যদি ওড জব করা লাগে তাহলে থেকে লাভ কি। সুতরাং বলে দিলাম যে আমার ডিগ্রি চাই সুইডেনে পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট পারমিট পাই আর না পাই।

অবশেষে আল্লাহর অশেষ রহমতে পিএইচডি রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয় ২০১৩ এর জানুয়ারীর ৩০ তারিখ। পিএইচডির হাফ টাইম শেষ হয়েছে জুন ২০১৪।

পথ চলছি….. আল্লাহ যতদুর নিয়ে যায়।

সবার দোয়াপ্রার্থী…….

জীবন ডায়েরী-০২

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাশ শুরু হলো ৯ জানুয়ারী ২০০১ সালে। ক্লাশ শুরু হতে না হতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছেলের সাথে স্টেশনবাজারের এক স্থানীয় লোকের বাত-বিতন্ডা থেকে শুরু করে ব্যাপক মারামারি শুরু হয়ে গেলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব সাধারন ছাত্র, সব রাজনৈতিক সংগঠন একপাশে আর স্টেশনবাজার সংলগ্ন এলাকা বাসী এক পাশে। ছাত্রদের সাথে যোগ দিলো বিনোদপুরের এলাকাবাসী পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা রণক্ষেত্র ধারন করলো মুহুর্তে। যারা যা আছে তা নিয়ে মারামারিতে ঝাপিয়ে পড়লো। পুরো স্টেশনবাজার আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরের সব দোকানপাঠ ভাংচুর করলো লুটপাট করলো সুযোগসন্ধানীরা। ফলস্বরূপ ফেব্রয়ারীর ১৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের সববিভাগের ক্লাশ বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষনা করা হলো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি হওয়ার পর পড়ায় কেন জানি কোন মজা পাচ্ছিলাম না। বার বার ভাবছিলাম ইয়ার ড্রপ দিয়ে মেডিক্যাল পরীক্ষাটা দেই, কিন্তু ফ্যামিলির কারো এসব ব্যাপারে মাথা ব্যাথা না থাকায় এভাবে প্রথম বর্ষ পরীক্ষা দিলাম। ফলাফল মোটামুটি হলো। দ্বিতীয় বর্ষে গিয়ে পড়ায় মনোযোগ দিলাম ফলাফল ভালো ই হলো। তৃতীয় বর্ষে প্রথম থেকে পড়া শুরু করলাম মে মাসে প্রষ্তুতি ৯০ ভাগ সম্পন্ন হলো পরীক্ষা অগাষ্টে পরিকল্পনা ছিলো তৃতীয় বর্ষে বড় একটা লিড দিয়ে প্রথমের দিকে চলে আসা। দ্বিতীয় বর্ষে লিড ছিলো ২২। যাহোক মানুষের ভাবনার সাথে সব সময় সব কিছু মিলেনা। হঠাত মে মাসে ছাত্রাবাস কমিটি বললো মেস ছাড়তে হবে, তারা মেসে কিছু সংস্কারের কাজ করবে। মেসটি ছিলো মসজিদ কমিটির।

ছাত্রাবাসটি পরিবর্তন করে আর একটি ছাত্রাবাসে উঠলাম। ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় হলে সিট হয়ে গেলো। ভাবছিলাম পরীক্ষার পর উঠবো। যাতে পরীক্ষায় কোন প্রভাব না পরে। কিন্তু কেনজানি হলে উঠে গেলাম। হলে উঠতেই এক বন্ধুর খপ্পড়ে পরে লাইফ লাইন (এমএলএম) বিজনেস জড়িয়ে পড়লাম। আমার রুমমেট বড় ভাই নিষেধ করেছিলেন। আমার মেসমেট বন্ধু রফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সে ও নিষেধ করেছিলো। কিন্তু সেই বন্ধুর প্রভাবে দিনের বেশিরভাগ ই কাটতে লাগলো বিনোদপুরে। যেখানে মে মাসে ৯০ ভাগ প্রস্তুতি সম্পন্ন সেখানে সেখান থেকে আর পড়া এগুলো না। এরপর সংগঠনেও জড়িয়ে পড়লাম সব ঠিক পরীক্ষার আগ মুহুর্তে ফল স্বরূপ তৃতীয় বর্ষে কিছু নম্বর কম পেলাম। প্রথম শ্রেনী থেকে কিছু কম হয়ে পড়লো। ভাবলাম একাডেমিক পড়াশোনা আর করবো না। যে ভাবা সেই কাজ আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে বাবা সরকারী চাকুরী করতেন সরকারী চাকুরী বিসিএস এর প্রতি প্রচন্ড আগ্রহ ছিলো। তাই বিসিএস, এমবিএ পরীক্ষার প্রতুষ্তি নিতে থাকলাম। চতুর্থ বর্ষে ফলাফল আগের মতই থাকলো পেছন থেকে অনেকে প্রথম শ্রেনী পাইলো। আমি ঐখানেই থেকে গেলাম। কিন্তু অন্য পরীক্ষার প্রস্তুতি সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলাম।

মাস্টার্ষ এ গিয়ে বন্ধুরা বলাবলি করতে লাগলো দোষ্ত তোর প্রথম শ্রেনীটা হাতে ধরে নষ্ট করলি পড় তোর এবার হয়ে যাবে। বন্ধু নয়ন প্রায় বলতো। এদিকে সংগঠনের কাজে কিছুটা পিছিয়ে পড়লাম ফলে অনেক সময় পেলাম সময় গুলো কাজে লাগালাম ফলস্বরূপ নন-থেসিস গ্রুপ থেকে প্রথম হয়ে বেরুলাম।

ভাবলাম বিসিএস দিয়ে প্রথমের দিকের পজিশন নিতে হবে। যেহেতু আগে একটু একাডেমিক পড়াশোনা কম করেছিলাম হাতে অনেক টাইম পেতাম। আমি আবার ঘোরাঘোরি কম করতাম, আড্ডাবাজো ছিলাম না তাই সময় গুলো স্টেশনবাজারে ইন্টারনেট এ ব্যবহার করে কেটে দিতাম কিছু সময়। ফলে সহপাঠীদের চেয়ে কিছু বিষয়ে এগিয়ে থাকলাম। থেসিস করা বন্ধুরা সুইডেনে অ্যাপ্লাই করবে ভাবছিলো আমি অ্যাপ্লাই করে দিলাম। ইংলিশ কোচিং করার খুব একটা দরকার হয়নি যেহেতু একাডেমিক পড়া কম করতাম ঐ সময় গুলো ইংলিশ পড়া প্রাকটিসে কেটে দিতাম ফলে এমনি পরীক্ষা দিয়ে প্রথমভাবে মোটামুটি চলার মত স্কোর পেয়ে গেলাম সুইডেনে ভর্তির সুযোগ পেলাম। সুইডেন চলে আসলাম। কিন্তু বিসিএস দেয়ার সেই যে প্রচন্ড আকাংখা সেটি থেকে গেলো।
ভেবেছিলাম বিসিএস ক্যাডার হবো কিন্তু সেটি আর হলো না চলে আসলাম সুইডেনে।

বাকিটুকু পরের পোষ্টে……

জীবন ডায়েরী-০১

মানুষ ভাগ্য যে আল্লাহর দ্বারা নির্ধারিত আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা তার প্রতাক্ষ্য সাক্ষী। আমার জীবনে বেশির ভাগ ঘটনার সাথে কেমন জানি তাকতলীয় কিছু ব্যাপার জড়িত, জীবনের ঘটনা গুলো যে আল্লাহর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা অনেকটা বুঝতে পারা যায়।
জন্মের পর থেকে গ্রামেই বড় হতে থাকি। গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আমার আব্বা। আব্বা শিক্ষক হওয়ার সুবাধে স্কুল জীবন শুরু করি কিছুটা আগে, আমার চেয়ে দু বছরে বড় এমন ছেলেদের সাথে ক্লাশ ওয়ান শুরু করেছিলাম, একদিন একরামুল নামে এক স্যার আমাকে রিডিং পড়া পড়তে বললে আমি আটকিয়ে যাচ্ছিলাম, স্যার সাথে সাথে আমাকে শিশু ক্লাশে পাঠিয়ে দেন। এরপর সেখান থেকে গ্রামের স্কুলে তৃতীয় শ্রেনী শেষ করি, এরপর যখন ক্লাশ ফোর শুরু করলাম সৈয়দপুর শহরে বাসা কিনলো আব্বা সেখানে নয়াটোলা স্কুলে ক্লাশ ফোর এর দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার আগে থেকে শুরু করলাম। গ্রাম থেকে শহরে গিয়ে ভালৈ করছিলাম। প্রাইমারীর সমাপনী পরীক্ষায় সেসময় থানায় ১৬ তম স্থান অধিকার করেছিলাম, সেসময় আমাদের নয়াটোলা স্কুল থেকে ৪ জন সমাপনীতে মেধাবী তালিকায় স্থান লাভ করে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, ১৬ তম এবং বিশতম। প্রথম হয়েছিলো আমার বন্ধু জয়, দ্বিতীয় রনি, আর ২০ তম রতন। সেই ব্যাচটা ছিলো নয়াটোলার সেরা ব্যাচ।
প্রাইমারী স্কুল থেকে হাইস্কুলে ভর্তি হব। লক্ষ্য ছিলো গভঃ টেকনিক্যাল নয়ত ক্যান্ট পাবলিক। টেকনিক্যাল এ পরীক্ষা দিয়ে অপেক্ষামান তালিকায় থাকলাম। ক্যান্টে পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়ে গেলাম। ভর্তিও হয়েছিলাম, কিন্তু মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি টাকা কম তাই অপেক্ষা করতে থাকলাম টেকনিক্যালএর জন্য । অবশেষে অনেক প্রহর শেষ করে সবার শেষের রোল নাম্বারটি দিয়ে স্কুল জীবন শুরু করলাম। স্কুলে সব সময় চুপচাপ থাকতাম, ঐ সময়ে আমি ছিলাম প্রচন্ড লাজুক একটি ছেলে। ক্লাশে কখনও ছুটোছুটি করতাম না। তবে কেন জানি ঐ সময়ে ক্লাশে বই পড়তাম। এভাবে সময় গুলো পার হচ্ছিলো। আল্লাহর অশেষ রহমতে সবার শেষ হয়ে শুরু করে সবার প্রথমের দিকে থেকে বের হতে পেরেছিলাম। একবার ক্লাশ এইটে বোর্ড থেকে নির্দেশ আসলো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ার জন্য যারা যারা পড়তে আগ্রহী ক্লাশের স্যার দাড়াতে বললেন, ঐ সময় আমার ক্লাশ রোল ৯, আমি দাড়ালাম ক্লাশে আহসান হাবীব স্যার নামের একজন স্যার ছিলেন আমাকে অপমানকর কিছু কথা শোনালেন যে আমি কিভাবে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ব। এমনি লাজুক ছিলাম প্রচন্ড অপমানবোধে সেদিন অনেক ঘেমেছিলাম।
স্কুল জীবনে অবশ্য আর কারো কাছে এমন কথা শুনিনি। তবে একটি জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম, স্যার রা যাদের চিনতেন তাদের কিছু বিষয়ের স্যার রা বেশি নম্বর দিতেন। যেমন; আমি কখনই বাংলা, ইংলিশে ৫০ এর মধ্যে ২০ এর উপরে পাইনি। ইংলিশ এ সব সময় পাইতাম ২১ 🙂 আর বাংলায় ১৭-২০ 🙂 তবে অন্য বিষয়গুলোতে বরাবরই অনেক নম্বর পাইতাম, এভাবে একদিন দশম শ্রেনীতে সামনের দিকে চলে এসেছিলা।
দশম শ্রেনীতে ফলাফল ভালৈ হয়েছিলো প্রশ্ন দেখা দিলো কোন কলেজে ভর্তি আমাদের সময়ে সৈয়দপুর ক্যান্ট ভালো ফলাফল করত কারন টেকনিক্যালের প্রথমের দিকে সবাই ক্যান্টে ভর্তি হতো। আমাদের সময়ের প্রিন্সিপাল স্যার বললেন তোরা এবার এখানেই থাক দেখ এখানেই ভালো ফল হবে। তবে স্কুলের কিছু স্যার এবং ম্যাডাম (কামরুন্নাহার ম্যাডাম) বলেছিলেন ঢাকা কলেজে অ্যাডমিশন নিতে। কিন্তু বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে কোন সারা না পেয়ে টেকনিক্যালেই থেকে যাই।

আমাদের দেখাদেখি টেকনিক্যাল স্কুলের (সায়েন্স স্কুল) বেশির ভাগ সহপাঠী ঐ কলেজেই থেকে গেলো। এইচএসসি ফলাফল সন্তোষ জনক হলোনা। সিদ্ধান্ত হলো মেডিক্যাল কলেজের কোচিং করবো। যেহেতু বাইরের জগত সম্পর্কে নলেজ কম বিষয়টি বন্ধু রনির উপর নির্ভর করলো সবাই মিলে রংপুর রেটিনায় কোচিং শুরু করলাম। কোচিং এর শুরু থেকে অনেক ভালো ফলাফল করলাম। A B C তিনটি শাখা মিলে পরীক্ষা হতো পরীক্ষায় প্রায় ১-৩ এর মধ্যে থাকতাম একবার এক ভাই বলেই বসলেন যে আর একটু স্কোর বেশি হলে ঢাকা মেডিক্যালে হয়ে যেত।
এভাবে কোচিং চলছিলো হঠাত বন্ধু রনির মাথায় বুদ্ধি আসলো কোচিং সে করবেনা বাসা থেকে ক্লাশ করবে বাসা সৈয়দপুরে। আমি জীবনে বাড়ির বাইরে থাকিনি সে যখন বাড়ি যাবে বললো আমিও তার সাথে সৈয়দপুর চলে গেলাম ২ মাস কোচিং করে। আর এক বন্ধু বিকু চলে গেলো রাজশাহী ওর ভাইয়ের কাছে। ওর ভাই ওকে গাইড দেয়া শুরু করলো। আমরা সৈয়দপুরে থেকে গেলাম। বরাবরই বাসার লোকজন কিছুই করলো না। টেকনিক্যালের প্রথমের দিকের স্টুডেন্ট হওয়ায় মনের মধ্যে আশংকা কাজ করা শুরু করলো যে যদি চান্স না পাই তাহলে মান-ইজ্জত সব নষ্ট হয়ে যাবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কনটেষ্ট গাইড কিনে পড়া শুরু করলাম। যেহেতু কেমিষ্ট্রি আগে থেকে ভালো লাগতো ঐ গাইড বইয়ের তিনটি বিষয়ের নাম ভালো লাগলো। বায়োকেমিষ্ট্রি, ফার্মাসী আর এ্যাপ্লাইড কেমিষ্ট্রি। কোচিং এবং ভালোভাবে পড়া ছাড়াই ঢাবি তে পরীক্ষা দিলাম সিরিয়াল ওনেক দুরে থাকলো, বাড়ির লোকজনও সাহায্য করলো না কোথায় ফর্ম নিবো ফর্ম নিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালের।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে গেলাম। যেহেতু অনেক লাজুক ছিলাম ভেবেছিলাম কোন বন্ধুর সাথে মেসে থাকবো। রাজশাহী গেলে এক বন্ধু নিজের কাছে না রেখে বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিবিরের রুমে উঠিয়ে ছিলো। সেই এক রুমে অনেক ছেলে। সবাই সারাদিন গল্প করে আমি পড়তে পারছিলাম না, ঐ দিকে ঐ বন্ধু আবার আগে ঘোষনা দিয়েছে তারা ৬ মাস থেকে রাজশাহীতে কোচিং করছে তারা চান্স না পেলে আমরা কিভাবে সৈয়দপুর থেকে গিয়ে চান্স পাবো। আবার পরীক্ষা দিয়ে রুমে ফিরলেই সবাই বলতো কেউ ৬০ পাবে কেউ ৭০ পাবে (৮০ এর মধ্যে) আমি দেখি হিসেব করে আমার ৪০-৪৫ এর ঘরে ঘুরাঘুরি করে। তিনটি পরীক্ষা দিলাম ফার্মাসী পরীক্ষা শনিবার দিন হবে মাঝখানে শুক্রবার। এক বন্ধু বাসায় ফিরছিলো ওকে বললাম আমার আর পরীক্ষা দিতে এখানে থাকতে ভালো লাগছেনা। সে বললো চল। ফার্মাসী পরীক্ষা না দিয়ে বাসা চলে গেলাম। বাসার লোকজন বললোনা যে চল পরীক্ষাটা দিয়ে আয়।

যাহোক ঐ সময়ে নিয়ম ছিলো শিবির সভাপতির রুমে খালি খাম আর পরীক্ষার রোল দিয়ে আসলে তারা রেজাল্ট পাঠিয়ে দিটো বাসায়। আমিতো অতো কিছু জানতাম না ভাবলাম চান্স হবে না তাই একটি খাম দিয়ে বাসা ফেরত আসি।

রেজাল্ট বের হওয়া শুরু করলো। কেমিষ্ট্রির রেজাল্ট আসলো ওয়েইটিং এ। বাকিগুলোর কোন খবর নেই। আমার মাথায় ছিলোনা যে আরো দুটি খাম ও রোল দিয়ে আসতে হবে। যেহেতু চান্স হবেনা তাই কাউকে বলিনি কারন সে বন্ধু বলেছিলো আমার চান্স হবে না। দু-বন্ধু চান্স পেলো দু-সাবজেক্টে। আমি ওয়িটিংএ। মন খারাপ করে বসে আছি। হঠাত যে বন্ধু আমাকে বলেছিলো আমার চান্স হবে না সে আমার বাসায় এসে বললো তোর বায়োকেমিষ্ট্রিতে হয়েছে তুই রাজশাহী যা, সে বললোনা কবে রাজশাহী যাইতে হবে। সে আমার প্রাইমারী স্কুল থেকে সহপাঠী আমার আব্বার নাম জানতো। রেজাল্টে আমার নামের পাশে আব্বার নাম দেখে বুঝেছে যে আমার হয়েছে। আমার এক বন্ধু ঐদিনই যাচ্ছিলো রাজশাহী ভাবলাম তার সাথে যাই। আর এক বন্ধু বললো যে থাক আগামী কাল সকালে যাস। সে আবার আমার অনেক ক্লোজ। বললাম তুই সিউর গেলে থেকে পরেরদিন যাবো। ওর আম্মা বললো থাকো আমি বলছি সে যাবে। আমি থেকে গেলাম। সে আবার আর এক বন্ধুকে ট্রেনে তুলে দেয়ার জন্য স্টেশনে গেলো।

স্টেশনে গিয়ে সে দেখতে পেলো ট্রেন আসতে একটু লেইট। দেখলো এক ছেলে প্লাটফর্মে দাড়িয়ে আছে। সে মিশুক ছিলো ছেলেটির সাথে কথা বলা শুরু করলো তাকে জিগ্গেস করলো কই যাচ্ছে সে বলে যে ভাইভা দিতে, তাকে জিগ্গেস করতেই তার মাথা্য হাত তার কাছে শুনে পরের দিন সকালে ভাইভা। আর ভাইভা মিস মানে অ্যাডমিশন হওয়া সম্ভব না। সে দ্রুত রিকশা নিয়ে বাসায় এসে আমাকে বললো চল তোকে আজকেই যাওয়া লাগবে। রাজশাহী পৌছালাম। পৌছিয়ে ভাবলাম দেখি অ্যাপ্লাইড কেমিষ্ট্রির কি অবস্থা দেখলাম সেখানে সিরিয়াল বায়োকেমিষ্ট্রির চেয়ে আরো আগে। ২৪ নম্বরে। বায়োকেমিষ্ট্রিতে ৭৫ নম্বরে।

অবশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বায়োকেমিষ্ট্রিতে পড়া শুরু করলাম। যদিও মনের মধ্যে একটা আকাংখা ছিলো যে মেডিক্যালে পড়ব। কারন যে স্কুল কলেজ থেকে যে পজিশন থেকে পাশ করেছি সেখান থেকে কেউই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি। তবে আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন শেষ পর্যন্ত অনেকদুর নিয়ে এসেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ শুরু হওয়ার পরের গল্প গুলো পরের পোষ্টে থাকবে, ইনশাল্লাহ।