বাবা হওয়ার অভিজ্ঞতা

বাবা হওয়ার ৪০ দিন পূর্ণ হলো, আলহামদুলিল্লাহ। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো হুট করে ঘটে কিন্তু এক একটি ঘটনা জীবনের পথকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেয়। নতুন চ্যালেঞ্জ সামনে এসে দাঁড়ায়। এই চ্যালেঞ্জকে সামলে নিতে না পারলে জীবন হয়ে উঠে বন্ধুর। মজার বিষয় হলো বিয়ের আগে অনেকেই বলবে বিয়ে করতে কিন্তু বিয়ের পর জীবন কেমন চলে সেটি খোঁজ নেয়ার মানুষদের খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি নেগেটিভ কারনে বলছিনা, জীবনটা এমনই। সব মানুষের জীবনেই সংগ্রাম করে চলতে হয়। জীবনের চ্যালেঞ্জগুলোকে মানুষকে একাকী মোকাবেলা করেই পথ চলতে হয়। আপনার বেবি নেই অনেকেই বলবে আরে আপনার বেবি নেই। নানা প্রশ্ন। বেবি হওয়ার পর জীবনের সব বাস্তবতা যখন সামনে এসে দাঁড়াবে তখন একাকী চলতে হবে সব সামলে। সব বাবার জীবনই এমন।

বাবা হওয়ার অনুভূতি কি জিনিস তখনও হয়ত পুরোটা অনুভব করতে পারিনি। মায়ের গর্ভের বেবিটাকে ডাক দেয়া নড়াচড়া করলে একটু পুলকিত হওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিলো। বেবির এক্সপেকটেড ডেলিভারি ডেট ছিলো ১৮ নভেম্বর। সবাই বলছিলো প্লাস/মাইনাস ২ সপ্তাহ। কিন্তু ১৮ নভেম্বর এর ৩-৪ দিন আগেও কোন লক্ষন দেখা যাচ্ছিলো না। আমি বেবির মাকে বলছিলাম দেখো তোমার বেবি ঠিক সময় আসবে। সে একদিন বেশি বা কম থাকতে চায় না। আল্লাহ তার জন্য যেটা নির্ধারন করেছে সেদিনই চলে আসবে ইনশাল্লাহ। কোন লক্ষন ছাড়াই ১৭ নভেম্বর সকাল শুরু হলো। সন্ধার দিকে বেবির মায়ের পেইন। আমাদের কোন অভিজ্ঞতা ছিলো না। আমি একটু অন্যরকম মানসিকতার মানুষ। গিন্নিকে বলেছিলাম কাউকে বলার দরকার নেই অচথা সবাই টেনসন করবে। আমাদের হেলপ ও করতে পারবে না। শুধু ফোন দিয়ে আরো স্ট্রেস বাড়িয়ে দিবে। তারচেয়ে আল্লাহর রহমতে সব কিছু ভালোভাবে হোক তারপর জানাবো। সুতরাং দুজন মিলে আল্লার রহমতের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। প্রথমে ভাবছিলাম পেইন অন্য কিছুর। কিন্তু পেইনের ইনটেনসিটি বাড়া শুরু করলো। গিন্নি ডাঃ মানুষ বললাম কি করা যায়। দুজন মিলে পেইনকে অবজারভ করা শুরু করলাম যে ফ্রিকুয়েন্সি কেমন। যেহেতু অ্যাকটিভ লেবার না হলে এসব দেশে হসপিটালে ভর্তি করায় না এবং যেহেতু আমরা সিউর ছিলাম না। তাই ফ্রিকুয়েন্সি এবং ইনটেনসিটি নোট ডাইন করা শুরু করলাম। ১ ঘন্টা তারপর আরো এক ঘন্টা অবজারভ করার পর। সিউর হলাম যে লেবার পেইন। কিন্তু অপেক্ষা করতে লাগলাম দেখি কি করা যায়। ১৮ নভেম্বর রাত ২ টা। গিন্নির পেইন অনেক বেশি হতে লাগলো। অবশেষে হসপিটালে ফোন দিলাম। আমি কথা বলার পর গিন্নিকে দিলাম। যখন সে বললো ফ্রিকুয়েন্সি ১০ মিনিটের কম আবার বেবির ম্যুভমেন্ট কমে গেছে সুতরাং নার্স বললো রাতেই হসপিটালে যেতে চেকআপ করাবে। কোন প্রস্তুতি ছাড়াই হসপিটালে রওনা দিলাম। হসপিটালে গিয়ে চেকআপ করানোর পর বলা হলো হসপিটালে রাতটা থাকতে। ভাবলাম রাত শেষ হলেই বুঝি বাসা যেতে পারবো। এক কাপড়েই থেকে গেলাম পুরো রাত পার হয়ে সকাল হলো। ইউরোপের সিস্টেম হলো লেবার রুমে প্যারেন্টের থাকা আবশ্যকীয়। প্রতিটি মুহুর্ত এক একটি অভিজ্ঞতা। সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকাল ১৮ই নভেম্বর। নতুন জীবনকে আলোর মুখ দেখাতে দেখছিলাম পেইন স্কেলের অসহায়ত্ব, আর ভাবছিলাম এজন্যই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মা দেরকে মর্যাদা দিয়েছেন। জন্মের আগ থেকে খাবারের অরুচি দিয়ে যার শুরু মানসিক পেইন থেকে শারীরিক পেইন। অতঃপর ১৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় আল্লাহ বাবুকে আলোর মুখ দেখালেন। বেচারা বের হয়ে এলেন আম্বিলিক্যাল কর্ডকে গলায় পেচিয়ে। নার্সদের চেহারায় উদ্বিগ্নতা ধরা পড়লো। বেবির নিশ্বাস নেই কয়েক সেকেন্ড। আমি কেমন জানি ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিলাম কি করবো, একদিকে গিন্নিকে সাপোর্ট দেয়া অন্যদিকে বেবির এই অবস্থা। একজন নার্স বললো-“ইউ শুড সি হোয়াট উই আর ডুয়িং উইথ ইউর বেবি” দৌড়ে গেলাম। বেবিকে অক্সিজেন সাপোর্ট দিলো ৩০ সেকেন্ডের মত তারপর সে কান্না শুরু করলো। অবশেষে স্ট্রেস কিছুটা কমলো। এরপর বেবিকে ওর মায়ের কাছে দিলে বেবি কিছুটা শান্ত হলো।
একদিন হাসপাতালে থাকার পর বাসায় ফিরলাম সব কিছু ঠিকঠাক দেখে। এখানে নিয়ম হলো একদিন পর একজন নার্স বাসায় এসে বেবিকে চেক করে যাবে সব ঠিক আছে কিনা। সে এসে চেপ করে দেখলো বেবির বিলিরুবিন অনেক বেশি। সুতরাং আবার হাসাপাতালে ছুটা। হাসপাতালে গিয়ে নিচ থেকে ফটোথেরাপি দিয়েও যখন বিলিরুবিন নিচে নামছিলোনা তখন উপর নিচ দু পাশ থেকেই ফটোথেরাপী দিয়ে ৭ দিন পর বিলিরুবিনের লেভেল রিস্ক লেভেল এর নিচে নামলো। এরপর বাসায় রওনা হলাম। বাবু ঠিক তার এক্সপেকটেড ডেইটের দিনেই তার নতুন পৃথিবীতে এসেছে আলহামদুলিল্লাহ। সেই ১৮ নভেম্বর থেকে জীবনের রুটিন পুরো চেঞ্জ হয়ে গেছে। প্রথম যে জিনিসটার কোন নিয়ম থাকেনা সেটি হলো ঘুম। আমি কি আরাম করে ঘুমাতাম সেটির আর কোন রুটিন থাকলোনা। বেবির মায়ের তো কোন কিছুরই রুটিন থাকলোনা। তবে মজার ব্যাপার হলো বাবুর কান্না শুনে খারাপ লাগেনা এটি হয়ত আল্লাহর রহমত সব বাবা মায়ের প্রতি, কোন বাবা মাই নিজের বেবির উপর বিরক্ত হয় না। কেমন একধরনের অটো দ্বায়িত্ব চলে আসে। এবং সব কিছুর উপর বেবিকে প্রাইওরিটি দিয়ে নিজেদের অন্যকাজ গুলোর প্রাইওরিটি ঠিক করা। এটাই হয়ত জীবন, এটাই জীবনের নিয়ম।
লিখার উদ্দেশ্য হলো, একজন বেবির জন্য মা বাবাকে কত কিছু সাক্রিফাইস করা লাগে তার শুরুটা হয়ত বুঝতে পেরেছি। যদিও আমি নিজের বাবা মাকে কখনই কষ্ট দেয় এমন কাজ করিনি। তারপর নিজেদের বেবি হওয়ার পর উপলব্ধি করতে পারলাম যে একজন মা কে কত কিছু সাক্রিফাইস করা লাগে, কত কষ্ট কত পেইন সহ্য করতে হয় শুধু একটি বেবিকে জন্ম দিতে এরপর জীবনের সব কিছুর থেকে কিছু না কিছু সাক্রিফাইস করে সন্তানকে বড় করে তোলে শুধুমাত্র সন্তানদের মুখে হাসি দেখার জন্য। একজন বাবাও অনেক সাক্রিফাইস করে যদিও মা দের তুলনায় অনেক কম। সেদিন আমার এক বন্ধু বলছিলো যে আস্তে আস্তে যত ত্যাগ করবি মায়া তত বাড়বে। হয়ত ব্যাপারটি এমনই ত্যাগের কারনে মায়া বাড়ে।

আমরা বড় হয়ে অনেকে হয়ত ভূলে যাই সেই শিশুকালের মা-বাবার ত্যাগের কথা। ভূলে যাই কত রাত ঘুমহীন কেটেছে শুধুমাত্র বেবিকে ঘুম পাড়ানোর জন্য। পৃথিবীর সব মা-বাবাই এই ত্যাগ গুলো করে। কিন্তু আমরা কজন সন্তানই বা পাড়ি সেই ত্যাগী মা-বাবাদের জন্য এক রাতের ঘুম নষ্ট করতে। নিজেদের ইনকাম থেকে মা-বাবাকে আগে প্রাইওরিটি দিতে। নিজেদের সূখের আগে মা-বাবার সূখকে প্রাইওরিটি দিতে।
আসুন যাদের মা-বাবা বেচে আছে, আমরা তাদের প্রতি আমাদের দ্বায়িত্বটুকু সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করি। আল্লাহ আমাদের কাজকে সহজ করে দিবেন, ইনশাল্লাহ।

সবাই আমাদের ছোট বাবুটার জন্য দোয়া করবেন। আল্লাহ যাতে তাকে মুত্তাক্বী হিসেবে কবুল করে। (আমীন)।

 

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s