স্নো (তুষাঢ়) প্রেমিক এবং কাদা প্রেমিক

শৈশব কেটেছে গ্রামে, তাই গ্রাম আমার প্রানকে যেন উজ্জ্বিবীত করে তোলে। গ্রাম ছেড়ে শহরমূখী হতে হয়েছিলো যখন আমি ক্লাশ ফোরের ছাত্র। এরপর যখনই গ্রামে যেতাম গিয়ে প্রথমে আমাদের পুকুরপাড়ে যেতাম সেখানে দাড়িয়ে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত দেখলে মনের মধ্যে অন্যরকম এক শান্তি বয়ে আসত। এরপরই দেখতাম আমার লাগানো গাছ গুলো কেমন আছে, গাছগুলোকে এখনো অনেক মিস করি, দেশে গেলে গ্রামে যাই শুধুমাত্র গাছগুলোকে দেখার জন্য। সবুজ গাছ আমার প্রয়ি আর বাংলার আকাশের নীল। যখন ছোট ছিলাম বর্ষায় গ্রামে মাছ ধরতে যেতাম কাদা মাখা ক্ষেতে। মাঝে মাঝে জমি কর্দমাক্ত করে হা-ডু-ডু খেলতাম তার আনন্দ বলে শেষ করা যাবেনা। সেই সময়ের আনন্দগুলো ছিলো অনেক প্রানবন্ত। আর শহুরে আনন্দ হলো ভুতুরে।

সেই প্রানের গ্রাম সোনার দেশ ছেড়ে বহুদুরে আললান্টিকের পাড়ে, বাল্টিকের তীড়ে পরে আছি বেশ ক বছর। বিদেশে আসা আমার কাছে বাড়তি কোন আনন্দ বয়ে আনেনি কখনও। কেনো জানি আমার কাছে এটি বিশেষ কোনো ব্যাপার মনে হয় না। কারন সংক্ষিপ্ত এই জীবনে কোথাও স্থায়ী থাকার সুযোগ নেই, কারন আমাদের মৃত্যু অবধারিত। সুতরাং কোথায় আছি এটির চেয়ে কেমন আছি তা খুব বেশি বিবেচ্য। এই বিবেচনা যদি আমরা উল্টো করে করি তাহলেই আমরা আমাদের শান্ত মনকে না পাওয়ার বদনায় ভিজিয়ে দেই।

বিদেশে আসার পর তুষাঢ় পড়া জিনিসটি নিয়ে মাঝে মাঝে মনেহয় একটু লিখবো। প্রায়ই দেখা যায় বিদেশে বসবাসরত বাংগালীরা তুষাঢ়কেই যেন জীবনের সবচেয়ে বড় বেশি পাওয়া মনে করে। স্নো পড়ার সাথে স্নোর সাথে নিজেদের বিভিন্ন আংগীকে ছবি মনেহয় স্নোর উপর হাটতে পারাতেই জীবনের চরম সার্থকতা। আসলে এগুলো মাঝে মাঝে আমাদের হীনমন্যতাই প্রকাশ করে। বিদেশে বসবাস করার সময় বিদেশের জিনিসগুলোকে আমরা যেভাবে গুরুত্বদিয়ে প্রকাশ করি অথচ তারচেয়ে কয়েক গুন সুন্দর জিনিস আমাদের বাংলাদেশের আনাচে কানাচে পড়ে থাকে। আমরা এগুলোতে নিজেদের সন্মান মনে করতে পারি না, আর একটি প্রধান কারন হলো আমরা নিজেদের সন্মান করতে শিখিনা। আমাদের মধ্যে আত্নশ্রদ্ধাবোধের চরম ঘাটতি। এরফলে আমাদের দেশের সুন্দর গ্রামগুলোর যে সৌন্দর্য্য সেগুলো বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরা খুব বেশি বড় মনেকরি না। এর কারন হলো আমরা আমাদের যা আছে সেটিকে সন্মান করিনা। আর এটি করতে না পারা বা করতে না শেখার কারনেই আমরা অনেক সময় কারন ছাড়াই দুঃখী হয়ে যাই। আমারতো মনেহয় বাংলাদেশের মত সুন্দর এক দেশে জন্ম এর জন্যই সূখি হওয়া উচিত। বাংলাদেশে ধর্মীয় চরমপন্থা নেই, বোমাবাজী নেই, হিন্দু-মুসলমান বা ধর্মে ধর্মে মারামারি নেই গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলো অল্পতে কিভাবে সুখী থাকা যায় তার জ্বলন্ত উদাহরন।

গ্রাম যখন মাঠভরে ধানক্ষেতে ভরে যায় তখন তার উপরে বাতাসের তরংগ অদ্ভূত সুন্দর এক পরিবেশের সৃষ্টি করে। পড়ন্ত বিকেলে সবুজ মাঠের উপর গ্রামীন ছেলেগুলোর খেলাধুলার মধ্যেও এক ধরনের প্রশান্তি। শেষ বিকেলে গ্রামমিন আকাসে বাড়ি ফেরা পাখীদের ঝাক আর কলরব এক স্বর্গীয় পরিবেশের তৈরী করে। আমরা অবশ্য এগুলো ভূলতে বসেছি এক অজানা চাওয়ার কারনে, আমরা ভাবি দেশান্তরী হলেই শান্তি অবশ্য কারনো আছে কারন মানুষ, সমাজ যখন অর্থকে বেশি বেশি সন্মান দেয়া শুরু করে, সমাজে যখন সন্মানের জায়গায় প্রভাব-প্রতিপত্তির বিস্তার ও প্রতিযোগিতা শুরু হয় তখন মানুষের মধ্যে টাকাওয়ালা হওয়ার বাসনা মানুষের মনের সৌন্দর্য্য কে নষ্ট করে দেয় ফলে মানসিক সৌন্দর্য্যহীন এক গ্রামীন সমাজ গড়ে উঠে। ফলে হারিয়ে যায় গ্রামীন সমাজের মূল ভিত্তি ভ্রাতৃত্ববোধ।

আমাদের গ্রামকে নিয়ে কাজ করতে হবে, বাংলাদেশের সমাজের মূল ভিত্তি যে গ্রামীন ট্রাডিশন সেগুলোকে ফিরিয়ে আনতে হবে, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের যে ঐতিহ্যগত গ্রাম সেটি ফিরে আসবে। হয়ত আবার কোন কবি কবিতা লিখবে “ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি”।

গ্রামীন সমাজের সৌন্দয্য ফিরিয়ে আনতে হলে, আইনের শাসনের পাশাপাশি গ্রামীন সমাজে বিনিয়োগের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে হবে। গ্রামীন স্কুল কলেজগুলোতে গ্রামীন ট্রাডিশনগুলোর উপর আলোচনা, সংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সেই বোধগুলোকে ফিরিয়ে আনার বা ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলেই মানুষ একটুখানি শান্তি স্বস্তির জন্য গ্রামকেই বেছে নিবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s