সংগঠন ভাবনাঃ আনুগত্য

আনুগত্য হলো ইসলামী সংগঠন তথা সব ধরনের সংগঠনের জন্য প্রান। আনুগত্য ছাড়া কোন সংগঠনই টিকতে পারে না। কারন আনুগত্যের কারনেই একটি সংগঠনে শৃংখলা টিকে থাকে। তবে ইসলামী সংগঠনের ক্ষেত্রে আনুগত্যের রূম কেমন হবে সেটি রাসুল (সাঃ) বাস্তব উদাহরন পেশ করে গিয়েছেন। বর্তমান সময়ে তাই আনুগত্যের বাস্তব উদাহরন হিসেবে রাসুল (সাঃ) রেখে যাওয়া উদাহরনই আমাদের সামনে একমাত্র চলার পাথেয়। রাসুল (সাঃ) ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন দু দুবার রাসুল (সাঃ) এর বক্ষ উম্মোচন করেছিলেন, বক্ষকে পরিষ্কার করে সেখান থেকে মানব আকাংখা, এবং অবাধ্যতা দুর করে, বিশ্বাস, আনুগত্য, জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা দিয়ে পরিপূর্ন করে দিয়েছিলেন। তাই মুহাম্মাদ (সাঃ) শুধু মানুষের মধ্যে ই না নবী ও রাসুলদের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ রাসুল হিসেবে মর্যাদা লাভ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআন পাক নাজিল করে মানব জাতিকে তার আনুগত্য করতে বললেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বলতেছেনঃ

4_59
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর-যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম।” সূরা আন নিসাঃ ৫৯

আরবী শব্দ “আতি” মানে হলো “আনুগত্য”। উপরের আয়াত হতে দেখা যায়, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন “আতিউল্লাহ ওয়া আতিউর‍রাসুলা” আল্লাহ এবং রাসুল দুটি শব্দের সাথেই “আতি” যোগ করা হয়েছে অথচ লক্ষ্যনীয় ব্যাপার হলো যখন বললেন “উলিল আমরি মিনকুম” তখন “আতি” শব্দটি ব্যবহার করলেন না। এখানে আল্লাহ রাব্বুল ইচ্ছে করেই এটি করেন নি কারন আল্লাহ জানতেন যে রাসুল (সাঃ) যে মানুষ গুলো ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করবে তাদের মধ্যে রাগ, ক্রোধ এবং ইগো এগুলো থাকবে ফলে মানুষ বায়াস হয়ে যেতে পারে আবেগের কাছে, ক্রোধের কাছে তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এটিকে “মাশরুত” বা কন্ডিশনাল করে দিয়েছেন।  আবার আনুগত্য করতে গিয়ে যদি কোন ধরনের বিরোধ দেখা দেয় তাহলে আল্লাহ হুকুম করেছেন আল্লাহ এবং তার রাসুলের কাছে ফিরে যেতে, অর্থাত কুরআন এবং হাদীসের স্মরনাপন্ন হতে।

হাদীস
“হযরত আলী (রাঃ) বলেন নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, গোনাহের কাজে কোন আনুগত্য নেই, আনুগত্য শুধু নেক কাজের ব্যাপারে”। (বুখারী, মুসলিম)

যতক্ষন পর্যন্ত আমীর বা নেতার আদেশ আল্লাহকে রাজী খুশি করানোর জন্য হবে ততক্ষন পর্যন্ত তার আনুগত্য করতে হবে।
কুরআনের আনুগত্যের অন্যান্য আয়াত গুলোতে আমীরের কোন কথা আসেনি। যেমন নিচের কয়েকটি আয়াত দেখলেই বুঝা যায়ঃ

4_80

“যে লোক রসূলের হুকুম মান্য করবে সে আল্লাহরই হুকুম মান্য করল। আর যে লোক বিমুখতা অবলম্বন করল, আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ), তাদের জন্য রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি।” সূরা আন-নিসাঃ৮০

47_33

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রসূলের (সাঃ) আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো না।” সূরা মুহাম্মদঃ৩৩

 

52.PNG

“”যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে তারাই কৃতকার্য।” সূরা নুরঃ৫২

নেতাদের উচিত হলো ন্যায়ভিত্তিক ফায়সালা করা। ন্যায়ভিত্তিক ফায়সালা নেতাদের প্রতি আল্লাহর একধরনের আদেশ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রাসুল (সাঃ) মুসলিমদের নেতা মনোনীত করে উনাকে বলে দিলেনঃ

105

“নিশ্চয় আমি আপনার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আপনি মানুষের মধ্যে ফয়সালা করেন, যা আল্লাহ আপনাকে হৃদয়ঙ্গম করান। আপনি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবেন না। সূরা আন-নিসাঃ১০৫

নেতারা যেহেতু মানুষের মধ্যে বিচারকের দ্বায়িত্ব পালন করে তাই তাদের কোমল হৃদয়ের অধিকারী হতে হয়। কর্মীদের অবুঝ সন্তানের মত তাদের দেখভাল করতে হয়, এগিয়ে নিতে হয় আল্লাহর পথে। এই কাজ করতে গিয়ে কখনই রাগ হওয়া বা কঠিন হৃদয় হওয়া ঠিক নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বলতেছেনঃ

3_159

“আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন পক্ষান্তরে আপনি যদি রাগ ও কঠিন হৃদয় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফেরাত কামনা করুন এবং কাজে কর্মে তাদের পরামর্শ করুন। অতঃপর যখন কোন কাজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলেন, তখন আল্লাহ তায়ালার উপর ভরসা করুন আল্লাহ তাওয়াক্কুল কারীদের ভালবাসেন।” সূরা আল-ইমরানঃ১৫৯

কুরআন এবং হাদীসে এরকম আরো অনেক আয়াত এবং হাদীস আছে যেগুলোতে নেতাদের উদ্দেশ্য করে উপদেশ দেয়া হয়েছে। ইসলামি সংগঠনে নেতাদের শুধু কর্মীদের উদ্দেশ্য বয়ান করতে দেখা যায়। কোন কারনে কোন কর্মী যদি নেতার মনোক্ষুন্নের কারন হয়ে দাড়ায়, ক্যাডার ভিত্তি সংগঠন গুলোতে দেখা যায় সামান্য কারনে অনেক সময় দলীয় মানহতে বহিঃষ্কার করা হয়। যা বাইয়াতের মর্যাদাকেই অনেক সময় ক্ষুন্ন করে তোলে। দেখা গেলো কে্উ কোন সংগঠনের সিনিয়র মেম্বার কথার সাথে মিল না হলেই সিনিয়র মেম্বারশীপ পদ বাতিল করে দেয়া হয় যেখানে নেতার/দ্বায়িত্বশীলের কোমল হওয়ার কথা অধঃস্তন কর্মীর কথা শোনার কথা সেখানে স্বেচ্ছাচারীর শাসকের মত এক তরফাভাবে কর্মীরকে হতাশ করে শুধুমাত্র মতের বিরোধ দেখা দেয়ার কারনে কর্মীর মানের সনদ বাতিল করা হয়। এর ফলে বাইয়াত যেমন একটি উপহাসের বস্তু হয়ে উপস্থাপিত হয় ঠিক তেমনি সংগঠনটি ইসলামিকের চেয়ে বেশি রাজনৈতিক হয়ে পড়ে। ফলে সংগঠনে আধাত্নিক মাধূর্যের ঘাটতি যেমন লক্ষনীয় হয়ে পড়ে ঠিক তেমনি সংগঠনে বিশৃংখলা দেখা দেয় ফলে সাধারন মানুষের উপর আধাত্নিকভাবে/নৈতিক প্রভাব বিস্তারে অক্ষম হয়ে পড়ে। দৃশ্যতঃ সংগঠনে গীবত ও পরচর্চা ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পায়, সংগঠনের মূল ভিত্তি “উখূয়াত” কে নষ্ট করে দিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক সংগঠনের মত কর্মীদের মধয়ে পারস্পারিক সহযোগিতার স্থানে প্রতিযোগিতার মনোভাব তৈরী হয় ফলে সামষ্ঠিক লক্ষ্য অর্জনে সংগঠন ব্যর্থ হয়ে পড়ে।

তাই কোন ইসলামী সংগঠনে আনুগত্যের শিক্ষা কর্মীদের জন্য যত বেশি না প্রয়োজন তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন দ্বায়িত্বশীলদের জন্য। আনুগত্যের মত একটি আমানতকে দ্বায়িতশীলরা যখন ব্যক্তি ইগোর বস্তু বানিয়ে ফেলে তখন কর্মীরা সেখানে অসহায়ের মত দিনাতিপাত করে। তাই ইসলামিক সংগঠনের দ্বায়িত্বশীলদের মধ্যে আনুগত্যের বাস্তব ট্রেনিং খুবই প্রয়োজন। যেখানে আনুগত্যে মানেই হলো নেতার একচ্ছত্র আধিপত্য মনে করা হয় সেসব ক্ষেত্রে বুঝা উচিত আনুগত্যের ভূল উদাহরনই আমরা তৈরী করছি।

হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় মুশরিকদের কঠিন কঠিন শর্ত দেখে অনেক সাহাবীরাই হতাশ হয়ে গিয়েছিলো। রাসুল (সাঃ) যখন মুশরিকদের শর্তে রাজী হয়ে গেলেন, তখন হযরত উমর (রাঃ) খুবই মনোক্ষুন্ন হয়ে রাসুল (সাঃ) কে প্রশ্ন করেছিলেন, যে হে আল্লাহর রাসুল! আপনি কি আল্লাহর রাসুল নন? আমরা কি মুসলিম নই?

রাসুল (সাঃ) উনার সাহাবাদের আবেগ বুঝতেন বলেই উনি সাহাবাদের অনেক ভালোবাসতেন। সাহাবা কেরামগনও রাসুল (সাঃ) এর প্রতি যে ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন সেটি নেতার প্রতি আনুগত্যের ও ভালোবাসার ইতিহাসে দৃষ্টান্ত হয়েই আছে।

কোন ইসলামী সংগঠনের দ্বায়িত্বশীলদেরই সবার আগে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হয়। নেতারা যদি কোমল হৃদয়ের অধিকারী না হয়, নেতারা যদি হালকা স্বভাবের মানুষের মত শোনা কথায় বিশ্বাস করে রাসুল (সাঃ) হাদীস ভূলে সংগঠনের কাজকে এগিয়ে নিতে চায় তাহলে সেখানে শয়তানেরই লাভ হয়। বর্তমানে অনেক ইসলামী সংগঠনের মধ্যে এরকম কিছু কিছু সমস্যা থেকেই গেছে। একটি সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি দ্বায়িত্বশীলের মানকে ধরে রাখার এবং দ্বায়িত্বের মত একটি আমানতের সঠিক ব্যবহারের বাস্তবমূখী ট্রেনিংই পারে একটি ভ্রাতৃত্বের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ইসলামী সমাজ বিনির্মান করতে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবার মধ্যে সেই যোগ্যতা এবং নিজেদেরকে মহসীন বান্দা হিসেবে তৈরী করার তৌফিক দান করুন। ওমা তৌফিক ইল্লাবিল্লা (আমীন)

 

আনুগত্য মানেই কি নেতার সামনে কাচুমাচু করে কথা বলা? আনুগত্য কেমন হওয়া উচিত…….?

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s