জীবন ডায়েরী-০১

মানুষ ভাগ্য যে আল্লাহর দ্বারা নির্ধারিত আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা তার প্রতাক্ষ্য সাক্ষী। আমার জীবনে বেশির ভাগ ঘটনার সাথে কেমন জানি তাকতলীয় কিছু ব্যাপার জড়িত, জীবনের ঘটনা গুলো যে আল্লাহর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা অনেকটা বুঝতে পারা যায়।
জন্মের পর থেকে গ্রামেই বড় হতে থাকি। গ্রামের প্রাইমারী স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আমার আব্বা। আব্বা শিক্ষক হওয়ার সুবাধে স্কুল জীবন শুরু করি কিছুটা আগে, আমার চেয়ে দু বছরে বড় এমন ছেলেদের সাথে ক্লাশ ওয়ান শুরু করেছিলাম, একদিন একরামুল নামে এক স্যার আমাকে রিডিং পড়া পড়তে বললে আমি আটকিয়ে যাচ্ছিলাম, স্যার সাথে সাথে আমাকে শিশু ক্লাশে পাঠিয়ে দেন। এরপর সেখান থেকে গ্রামের স্কুলে তৃতীয় শ্রেনী শেষ করি, এরপর যখন ক্লাশ ফোর শুরু করলাম সৈয়দপুর শহরে বাসা কিনলো আব্বা সেখানে নয়াটোলা স্কুলে ক্লাশ ফোর এর দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার আগে থেকে শুরু করলাম। গ্রাম থেকে শহরে গিয়ে ভালৈ করছিলাম। প্রাইমারীর সমাপনী পরীক্ষায় সেসময় থানায় ১৬ তম স্থান অধিকার করেছিলাম, সেসময় আমাদের নয়াটোলা স্কুল থেকে ৪ জন সমাপনীতে মেধাবী তালিকায় স্থান লাভ করে যথাক্রমে প্রথম, দ্বিতীয়, ১৬ তম এবং বিশতম। প্রথম হয়েছিলো আমার বন্ধু জয়, দ্বিতীয় রনি, আর ২০ তম রতন। সেই ব্যাচটা ছিলো নয়াটোলার সেরা ব্যাচ।
প্রাইমারী স্কুল থেকে হাইস্কুলে ভর্তি হব। লক্ষ্য ছিলো গভঃ টেকনিক্যাল নয়ত ক্যান্ট পাবলিক। টেকনিক্যাল এ পরীক্ষা দিয়ে অপেক্ষামান তালিকায় থাকলাম। ক্যান্টে পরীক্ষা দিয়ে চান্স পেয়ে গেলাম। ভর্তিও হয়েছিলাম, কিন্তু মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি টাকা কম তাই অপেক্ষা করতে থাকলাম টেকনিক্যালএর জন্য । অবশেষে অনেক প্রহর শেষ করে সবার শেষের রোল নাম্বারটি দিয়ে স্কুল জীবন শুরু করলাম। স্কুলে সব সময় চুপচাপ থাকতাম, ঐ সময়ে আমি ছিলাম প্রচন্ড লাজুক একটি ছেলে। ক্লাশে কখনও ছুটোছুটি করতাম না। তবে কেন জানি ঐ সময়ে ক্লাশে বই পড়তাম। এভাবে সময় গুলো পার হচ্ছিলো। আল্লাহর অশেষ রহমতে সবার শেষ হয়ে শুরু করে সবার প্রথমের দিকে থেকে বের হতে পেরেছিলাম। একবার ক্লাশ এইটে বোর্ড থেকে নির্দেশ আসলো ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ার জন্য যারা যারা পড়তে আগ্রহী ক্লাশের স্যার দাড়াতে বললেন, ঐ সময় আমার ক্লাশ রোল ৯, আমি দাড়ালাম ক্লাশে আহসান হাবীব স্যার নামের একজন স্যার ছিলেন আমাকে অপমানকর কিছু কথা শোনালেন যে আমি কিভাবে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ব। এমনি লাজুক ছিলাম প্রচন্ড অপমানবোধে সেদিন অনেক ঘেমেছিলাম।
স্কুল জীবনে অবশ্য আর কারো কাছে এমন কথা শুনিনি। তবে একটি জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম, স্যার রা যাদের চিনতেন তাদের কিছু বিষয়ের স্যার রা বেশি নম্বর দিতেন। যেমন; আমি কখনই বাংলা, ইংলিশে ৫০ এর মধ্যে ২০ এর উপরে পাইনি। ইংলিশ এ সব সময় পাইতাম ২১ 🙂 আর বাংলায় ১৭-২০ 🙂 তবে অন্য বিষয়গুলোতে বরাবরই অনেক নম্বর পাইতাম, এভাবে একদিন দশম শ্রেনীতে সামনের দিকে চলে এসেছিলা।
দশম শ্রেনীতে ফলাফল ভালৈ হয়েছিলো প্রশ্ন দেখা দিলো কোন কলেজে ভর্তি আমাদের সময়ে সৈয়দপুর ক্যান্ট ভালো ফলাফল করত কারন টেকনিক্যালের প্রথমের দিকে সবাই ক্যান্টে ভর্তি হতো। আমাদের সময়ের প্রিন্সিপাল স্যার বললেন তোরা এবার এখানেই থাক দেখ এখানেই ভালো ফল হবে। তবে স্কুলের কিছু স্যার এবং ম্যাডাম (কামরুন্নাহার ম্যাডাম) বলেছিলেন ঢাকা কলেজে অ্যাডমিশন নিতে। কিন্তু বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে কোন সারা না পেয়ে টেকনিক্যালেই থেকে যাই।

আমাদের দেখাদেখি টেকনিক্যাল স্কুলের (সায়েন্স স্কুল) বেশির ভাগ সহপাঠী ঐ কলেজেই থেকে গেলো। এইচএসসি ফলাফল সন্তোষ জনক হলোনা। সিদ্ধান্ত হলো মেডিক্যাল কলেজের কোচিং করবো। যেহেতু বাইরের জগত সম্পর্কে নলেজ কম বিষয়টি বন্ধু রনির উপর নির্ভর করলো সবাই মিলে রংপুর রেটিনায় কোচিং শুরু করলাম। কোচিং এর শুরু থেকে অনেক ভালো ফলাফল করলাম। A B C তিনটি শাখা মিলে পরীক্ষা হতো পরীক্ষায় প্রায় ১-৩ এর মধ্যে থাকতাম একবার এক ভাই বলেই বসলেন যে আর একটু স্কোর বেশি হলে ঢাকা মেডিক্যালে হয়ে যেত।
এভাবে কোচিং চলছিলো হঠাত বন্ধু রনির মাথায় বুদ্ধি আসলো কোচিং সে করবেনা বাসা থেকে ক্লাশ করবে বাসা সৈয়দপুরে। আমি জীবনে বাড়ির বাইরে থাকিনি সে যখন বাড়ি যাবে বললো আমিও তার সাথে সৈয়দপুর চলে গেলাম ২ মাস কোচিং করে। আর এক বন্ধু বিকু চলে গেলো রাজশাহী ওর ভাইয়ের কাছে। ওর ভাই ওকে গাইড দেয়া শুরু করলো। আমরা সৈয়দপুরে থেকে গেলাম। বরাবরই বাসার লোকজন কিছুই করলো না। টেকনিক্যালের প্রথমের দিকের স্টুডেন্ট হওয়ায় মনের মধ্যে আশংকা কাজ করা শুরু করলো যে যদি চান্স না পাই তাহলে মান-ইজ্জত সব নষ্ট হয়ে যাবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কনটেষ্ট গাইড কিনে পড়া শুরু করলাম। যেহেতু কেমিষ্ট্রি আগে থেকে ভালো লাগতো ঐ গাইড বইয়ের তিনটি বিষয়ের নাম ভালো লাগলো। বায়োকেমিষ্ট্রি, ফার্মাসী আর এ্যাপ্লাইড কেমিষ্ট্রি। কোচিং এবং ভালোভাবে পড়া ছাড়াই ঢাবি তে পরীক্ষা দিলাম সিরিয়াল ওনেক দুরে থাকলো, বাড়ির লোকজনও সাহায্য করলো না কোথায় ফর্ম নিবো ফর্ম নিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালের।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে গেলাম। যেহেতু অনেক লাজুক ছিলাম ভেবেছিলাম কোন বন্ধুর সাথে মেসে থাকবো। রাজশাহী গেলে এক বন্ধু নিজের কাছে না রেখে বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিবিরের রুমে উঠিয়ে ছিলো। সেই এক রুমে অনেক ছেলে। সবাই সারাদিন গল্প করে আমি পড়তে পারছিলাম না, ঐ দিকে ঐ বন্ধু আবার আগে ঘোষনা দিয়েছে তারা ৬ মাস থেকে রাজশাহীতে কোচিং করছে তারা চান্স না পেলে আমরা কিভাবে সৈয়দপুর থেকে গিয়ে চান্স পাবো। আবার পরীক্ষা দিয়ে রুমে ফিরলেই সবাই বলতো কেউ ৬০ পাবে কেউ ৭০ পাবে (৮০ এর মধ্যে) আমি দেখি হিসেব করে আমার ৪০-৪৫ এর ঘরে ঘুরাঘুরি করে। তিনটি পরীক্ষা দিলাম ফার্মাসী পরীক্ষা শনিবার দিন হবে মাঝখানে শুক্রবার। এক বন্ধু বাসায় ফিরছিলো ওকে বললাম আমার আর পরীক্ষা দিতে এখানে থাকতে ভালো লাগছেনা। সে বললো চল। ফার্মাসী পরীক্ষা না দিয়ে বাসা চলে গেলাম। বাসার লোকজন বললোনা যে চল পরীক্ষাটা দিয়ে আয়।

যাহোক ঐ সময়ে নিয়ম ছিলো শিবির সভাপতির রুমে খালি খাম আর পরীক্ষার রোল দিয়ে আসলে তারা রেজাল্ট পাঠিয়ে দিটো বাসায়। আমিতো অতো কিছু জানতাম না ভাবলাম চান্স হবে না তাই একটি খাম দিয়ে বাসা ফেরত আসি।

রেজাল্ট বের হওয়া শুরু করলো। কেমিষ্ট্রির রেজাল্ট আসলো ওয়েইটিং এ। বাকিগুলোর কোন খবর নেই। আমার মাথায় ছিলোনা যে আরো দুটি খাম ও রোল দিয়ে আসতে হবে। যেহেতু চান্স হবেনা তাই কাউকে বলিনি কারন সে বন্ধু বলেছিলো আমার চান্স হবে না। দু-বন্ধু চান্স পেলো দু-সাবজেক্টে। আমি ওয়িটিংএ। মন খারাপ করে বসে আছি। হঠাত যে বন্ধু আমাকে বলেছিলো আমার চান্স হবে না সে আমার বাসায় এসে বললো তোর বায়োকেমিষ্ট্রিতে হয়েছে তুই রাজশাহী যা, সে বললোনা কবে রাজশাহী যাইতে হবে। সে আমার প্রাইমারী স্কুল থেকে সহপাঠী আমার আব্বার নাম জানতো। রেজাল্টে আমার নামের পাশে আব্বার নাম দেখে বুঝেছে যে আমার হয়েছে। আমার এক বন্ধু ঐদিনই যাচ্ছিলো রাজশাহী ভাবলাম তার সাথে যাই। আর এক বন্ধু বললো যে থাক আগামী কাল সকালে যাস। সে আবার আমার অনেক ক্লোজ। বললাম তুই সিউর গেলে থেকে পরেরদিন যাবো। ওর আম্মা বললো থাকো আমি বলছি সে যাবে। আমি থেকে গেলাম। সে আবার আর এক বন্ধুকে ট্রেনে তুলে দেয়ার জন্য স্টেশনে গেলো।

স্টেশনে গিয়ে সে দেখতে পেলো ট্রেন আসতে একটু লেইট। দেখলো এক ছেলে প্লাটফর্মে দাড়িয়ে আছে। সে মিশুক ছিলো ছেলেটির সাথে কথা বলা শুরু করলো তাকে জিগ্গেস করলো কই যাচ্ছে সে বলে যে ভাইভা দিতে, তাকে জিগ্গেস করতেই তার মাথা্য হাত তার কাছে শুনে পরের দিন সকালে ভাইভা। আর ভাইভা মিস মানে অ্যাডমিশন হওয়া সম্ভব না। সে দ্রুত রিকশা নিয়ে বাসায় এসে আমাকে বললো চল তোকে আজকেই যাওয়া লাগবে। রাজশাহী পৌছালাম। পৌছিয়ে ভাবলাম দেখি অ্যাপ্লাইড কেমিষ্ট্রির কি অবস্থা দেখলাম সেখানে সিরিয়াল বায়োকেমিষ্ট্রির চেয়ে আরো আগে। ২৪ নম্বরে। বায়োকেমিষ্ট্রিতে ৭৫ নম্বরে।

অবশেষে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বায়োকেমিষ্ট্রিতে পড়া শুরু করলাম। যদিও মনের মধ্যে একটা আকাংখা ছিলো যে মেডিক্যালে পড়ব। কারন যে স্কুল কলেজ থেকে যে পজিশন থেকে পাশ করেছি সেখান থেকে কেউই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েনি। তবে আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন শেষ পর্যন্ত অনেকদুর নিয়ে এসেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাশ শুরু হওয়ার পরের গল্প গুলো পরের পোষ্টে থাকবে, ইনশাল্লাহ।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s