দেশীয় ট্রাডিশন বনাম ইসলামিক ট্রাডিশন

ঘটনা ১ঃ লোকটি খুব ইসলামের কথা বলে। বাচ্চাগুলোকে ইসলামের পালনের জন্য কড়া শাসনে রাখছে। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে সঠিকভাবে কেয়ার করবে সেটি তিনি করতে পারবেন না। তিনি হলেন স্বৈরশাসক। যে সব ফ্যামিলিতে এমন লোক আছে সে ফ্যামিলির বাচ্চারা ইসলাম নিয়ে কনফিউসনে ভূগে। পরিবারের বাচ্চাগুলো ছোট বেলা থেকে ইসলামের কথা শুনে শুনে বড় হয় কিন্তু পরিবারের কর্তা ব্যক্তির আচরনে তারা দ্বিধা নিয়ে বড় হয়। পরিবারের কর্তা ব্যক্তির জন্য মুসলিমদের নিয়ে তাদের মনে এক ধরনের ভয় তৈরী হয়। ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে ইসলাম পালন তো পরের কথা মুসলিম পুরুষকে /নারীকে বিয়ে করতেই ভয় পায়।

ঘটনা ২ঃ ছেলে বড় হয়েছে বিয়ে করবে, ছেলে বিয়ে করবে ছেলের মনের মত ছেলে ভালো মুসলিম কিন্তু সমস্যা হলো পরিবার সম্মতি দিচ্ছে না। পাশের বাড়িতে থাকে অন্য ধর্মের লোক তারা পরিবারটিকে মুসলিম পরিবার হিসেবে জানে। সুতরাং তারা ভেবে বসলো এটি ইসলামের একটি সিসটেম, মুসলিম রা ব্যাকডেটেড।

ঘটনা ৩ঃ রহিম সাহেব কথায় কথায় ৪ টা বিয়ের কথা বলে। বউকে শাসায় ৪ টা বিয়ে করবো। বউকে পিটায় কারন স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেস্ত। পাশের বাড়ির লোক অন্য দেশের তারা ভেবে নিলো এটাও ইসলামের সিসটেম।

ইসলামিক ট্রাডিশন বনাম দেশিয় ট্রাডিশন
এই দুই জিনিসের পার্থক্য করতে পারলে, নিজেদের পরিচয় সম্বন্ধে সঠিক ধারনা না থাকলে মানুষের মধ্যে ভূল বার্তা চলে যায়। আমরা যখন কথায় কথায় নিজেদের ভালো মুসলিম হিসেবে প্রমান করার চেষ্টা করি, অন্যদের যখন ইসলামের ভালো কথা বলে বেড়াই, যখন আমরা কথা দিয়ে ইসলাম কায়েম করে ফেলি তখন যদি সেই কথার সাথে ব্যক্তি জীবনের ইসলামের চর্চার মিল না থাকে তাহলে মানুষের মধ্যে খোদ ইসলাম নিয়ে সন্দেহ তৈরী হয়। কারন শয়তান মানুষকে ইসলাম থেকে দুরে সরানোর অনেক চেষ্টা করে। জন্মগত ভাবে আমরা মুসলিম হওয়ার কারনে ইসলামের বিষয়গুলিকে বিষদ ভাবে জানা ও মানা আমাদের সবার পক্ষে সম্ভবপর হয়ে উঠেনা। ফলে দেশিয় মনোবৃত্তি আর ইসলামের পরিচয় যখন মিশ্রন ঘটে তখন বেশির ভাগ সময়ে আমাদের চরিত্রে দেশিয়/ভূ-জাতিগত বৈশিষ্ট্য প্রাধান্য লাভ করে ফলে ইসলাম পালন করতে গিয়ে আমরা স্থানীয় ট্রাডিশনের আলোকে পালনের চেষ্টা করি। অনেক ক্ষেত্রে দেশিয় ট্রাডিশনকে ইসলামের ট্রাডিশন মনে করে সেটিকে বিশ্বাসে পরিনত করি এবং সেটি আমল না হলে ঈমান বরবাদ হয়ে যাবে এমনটি মনে করি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ইসলামকে ভূলভাবে উপস্থাপন করি। এরকম একটি উদাহরন দেয়া যায়, সংগঠনের আনুগত্যের ব্যাপারে।
দেশিয় ট্রাডিশনে দলীয় নেতার আনুগত্য হলো প্রভুর সামনে মাথা নত করার সমান (নাউযুবিল্লাহ)। এখানে দেশীয় ট্রাডিশনকে ইসলামের সিসটেমের মধ্যে ঢুকানোর ফলে দলীয় নেতাদের সামনে কাচুমাচু করা, মতের সাথে দ্বি-মত করা এমনকি নেতাদের সাথে মতানৈক্য দেখা দিলে সেটিকে ঈমানের সাথে সাংঘার্ষিক মনে করা হয়। অথচ হযরত উমর (রাঃ) মত সাহাবাদের ভরা মসজিলে জবাবদিহি করতে হয়েছিলো। দেশিয় কালচারে বড় হয়ে উঠা লিডার রা জবাবদিহি ত বড় কথা তাদের সামনে যুক্তিপূর্ণ কথাকে সংগঠনের আনুগত্যর বরখেলাপ মনে করে। অথচ ইসলামের ট্রাডিশনে এসবের কোন ভিত্তি নেই।

আমরা যখন মানুষের সামনে পরিচয় দেই তখন স্বভাব গত ভাবে আমারা আমাদের জান্নাতি হিসেবে পরিচয় হওয়ার চেষ্টা করি। দেশিয় পরিচয় কে পরে প্রাধান্য দেই বেশির ভাগ সময়েই। এই কাজটি বেশি করে ইসলাম প্রেমিক লোক গুলৈ। কারন তারা মনেকরে ইসলামের পরিচয় দিতে পারলেই হয়ত জান্নাতে চলে যাবে কিন্তু সেই পরিচয় দিতে গিয়ে ব্যক্তি ইসলামের সঠিক চর্চা না থাকায় বা না জানায় হিতে বিপরীত হয়ে দাড়ায়। প্রাকটিসিং মুসলিমদের ও বিপদে ফেলে দেয়। যেমন অনেকেই মুসলিম পরিচয় দিয়েও অ্যালকোহল পান করে যখন কোন অন্যধর্মের লোক ভালো মুসলিম দেখে তখন তাকে নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়।

বাংলাদেশে বিয়ের ক্ষেত্রে ছেলে মেয়ের কোন অনুমতি অনেক ক্ষেত্রে নেয়া হয় না। বাইরের দেশের মানুষ এগুলোকে ইসলামের কালচার মনে করে কারন তারা জানে আমরা সবাই মুসলিম। আবার বাংলাদেশের অনেক স্বামী বউকে তাদের সম্পত্তি মনে করে, তাদের উপর তাদের বস-কর্মচারীর সম্পর্কের মত আচরন করে। আবার বউয়েরাও এগুলোকে মেনে নেয় জান্নাতে যাওয়ার স্বপ্নে।

এসব কিছুই হয় মূলত সঠিক শিক্ষার অভাবে এবং দুই ট্রাডিশনকে পার্থক্য করতে না পারার কারনে।

আমার ল্যাবের একজন সেদিন প্রশ্ন করেছিলো যে ইসলামে চারটি বিয়ে করা যায় কিনা কেন? আমরা মুসলিম পুরুষরা চারটি বিয়ের কথাকে প্রচার করেছি নিজেদের ভোগের স্বার্থেই। চারটি বিয়ের কথা প্রচার করেছি ঠিকই কিন্তু তার শর্তগুলো প্রচার করেছি কম। ফলে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরী হয়। মানুষ ইসলাম নিয়ে ভূল বুঝে।

বাদাম খেয়ে পেট খারাপ হলে নাকি তার উপরের বাদামী পর্দাটা সহ খেলে ভালো হয়ে যায়। শুধু বাদামের ফজিলত বর্ণনা করার ফলে বেশি খাওয়ার ফলে যখন অনেকের পেট নষ্ট হয়ে যায় তখন ওষুধের ব্যবস্থা করা ছাড়া উপায় থাকেনা।

আমার কাছে মনেহয় কেউ যদি ভালো মুসলিম না হয়, বা যদি কারো ইসলাম নিয়ে ভালো ধারনা না থাকে তাহলে অন্যধর্মের লোকের কাছে মুসলিম পরিচয়ের প্রাধান্য না দিয়ে ভূ-জাতিগত
পরিচয় দেয়াই শ্রেয়। আবার সংগঠনের জন্য যারা ইসলাম নিয়ে কাজ করে, ইসলামকে প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে তাদের ইসলামি ট্রাডিশন এবং দেশীয় ট্রাডিশনের উপর বেশি বেশি ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা দরকার। তাহলে মানুষ বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পাবে।

জন্মগত মুসলিম হওয়ার কারনে, দিনশেষে আমরা বাংলাদেশি হয়ে ঘরে ঢুকি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s