ইসলামে শ্রমিকের মর্যাদা

আগামীকাল আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। প্রতি বছর মে মাসের ১ তারিখ এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। ১৮৮৬ সালের ৪ মে শিকাগোয় শ্রমিকদের সমাবেশে পুলিশের গুলি বর্ষনকে উপলক্ষ্য করে প্রতি বছর মে মাসে এই দিবসটি পালন করা হয়ে থাকে। তারপর শ্রমের বৈষম্য শ্রমিকের মজুরীর বৈষম্য প্রকট। প্রতি বছর এরকম হাজারো দিবস পালন করা হয়ে থাকে। অথচ সমাজের বৈষম্য দুরীকরনে কোন বাস্তব পদক্ষেপ না থাকায় এসবের কোন সমাধান হয় না। পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিদিন কোথাও না কোথাও শ্রমিকের উপর নির্যাতন, গৃহ পরিচারীকাদের উপর নির্মম নিষ্ঠুরতা মাঝে মাঝে আমাদের আচরনকে পশুর চেয়ে নির্মম মনে করে দেয়। এর মূল কারন হলো ইসলামের শিক্ষা থেকে দূরে সরে যাওয়া। মানুষে মানুষে শ্রদ্ধাবোধ না থাকা। সেদিন এক প্রফেসর বললেন যে, তোমরা অনেক লাকি যে, তোমরা মুসলিম তোমাদের অ্যালকোহল পান করতে হয় না। আল্লাহর এক নির্দেশ অ্যালকোহল পান হারাম, তাতে সমাজে আমূল পরিবর্তন কোন মুসলিম স্বজ্ঞানে অ্যালকোহন পান করতে পারে না। অথচ হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে প্রচারনা চালিয়ে ও তাদের সমাজে এসবের বাস্তব কোন অগ্রগতি নেই।

এরকম নারী দিবস, মা দিবস আরো কত দিবস। বছরের প্রতিদিন এ একটি করে দিবস পালন করা হয়।

অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে কত সুন্দর নিয়ম বলে দিয়েছেন , যা পালন করলে, আমল করলে সমাজের মধ্যে এসব দিবসের পালন করার দরকার হতো না। ইসলামে মানুষে মানুষে সমতা, ন্যায় ও সাম্যর কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে শ্রমিকের মজুরীর কথাও। ন্যায় ও স্বচ্ছ লেনদেনকে ইসলামে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। সামাজিক ন্যায় বিচার ছাড়া সমাজে শান্তি ও শৃংখলা রক্ষা করা খুবই কঠিন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কুরআনে বর্ণনা করেছেন,
“হে ঈমানদারগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাক; আল্লাহর ওয়াস্তে ন্যায়সঙ্গত সাক্ষ্যদান কর, তাতে তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতার অথবা নিকটবর্তী আত্নীয়-স্বজনের যদি ক্ষতি হয় তবুও। কেউ যদি ধনী কিংবা দরিদ্র হয়, তবে আল্লাহ তাদের শুভাকাঙ্খী তোমাদের চাইতে বেশী। অতএব, তোমরা বিচার করতে গিয়ে রিপুর কামনা-বাসনার অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা পাশ কাটিয়ে যাও, তবে আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় কাজ কর্ম সম্পর্কেই অবগত।” সূরা নিসাঃ ১৩৫

এই জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও পেশা নির্বিশেষে পৃথিবীতে সকল মানুষই সমান। ছোট-বড়, ধণী-গরিব, সাদা-কালো, দেশী-বিদেশী বৈধ কাজের জন্য সবার সমানভাবে সন্মান পাওয়ার উচিত।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে বলেছেন,

“হে মানব, আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিতি হও। নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সে-ই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।” সূরা হুজুরাতঃ ১৩

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের কে এক আদম (আঃ) আর বিবি হাওয়া থেকে পয়দা করেছেন। মানুষ হিসেবে আমাদের সবার সমান সম্মান পাওয়ার অধিকার আছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনই কাউকে ছোট কাউকে বড় করেছেন শুধুমাত্র পরীক্ষা করার জন্য। এর জন্য কিয়ামতে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন,
”তিনিই তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছেন এবং একে অন্যের উপর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, যাতে তোমাদের কে এ বিষয়ে পরীক্ষা করেন, যা তোমাদেরকে দিয়েছেন। আপনার প্রতিপালক দ্রুত শাস্তি দাতা এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল, দয়ালু।” সূরা আল আনআমঃ১৬৫

সূরা যুখরুফ এর ৩২ নং আয়াতে বলতেছেন,
“তারা কি আপনার পালন কর্তার রহমত বন্টন করে? আমি তাদের জীবিকা বন্টন করেছি পার্থিব জীবনে এবং একের মর্যাদাকে অপরের উপর উন্নীত করেছি, যাতে একে অপরকে সেবক রূপে গ্রহন করে।”

নবী করীম সাঃ বিদায় হজ্জ্বের ভাষনে বলেছিলেন;
“হে মানুষেরা! অবশ্যই তোমাদের প্রভু একজনই। তোমাদের পিতা একজনই। আরবের উপর অনারবের, অনারবের উপর আরবের, কালোর উপর সাদার, কিংবা সাদার উপর কালোর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই, শ্রেষ্ঠত্ব কেবল মাত্র আল্লাহর উপর ভক্তির উপর” মুসনাদ আহমাদ।

ইসলামে শারীরিক শ্রমকে মর্যাদা দেয়া হয়েছে। যারা নিজের অর্জিত জীবিকা দিয়ে জীবনযাপন তাদেরকে সম্মানিত করা হয়েছে। শ্রমিকের সাথে যখন কাজের চুক্তি অবশ্যই ন্যায় সঙ্গত হওয়া জরূরী। শ্রমিকদের তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য জানানো উচিত।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কুরআনে বলছেন,
“হে বিশ্বাসীগন! তোমরা তোমাদের চুক্তিকে পূর্ণ কর” সূরা মায়েদাঃ ১
নবী করীম সাঃ বলেছেন,
“মুসলিমদের অবশ্যই চুক্তি রক্ষা করে চলা উচিত।” তিরমিযী
শ্রমিকদের সম্মানের সাথে আচরন করা উচিত। ইসলামে শ্রমিকদের সাথে কোমল ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

“আর উপাসনা কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্নীয়, এতীম-মিসকীন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিতজনকে। যারা নিজেরাও কার্পন্য করে এবং অন্যকেও কৃপণতা শিক্ষা দেয় আর গোপন করে সে সব বিষয় যা আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দান করেছেন স্বীয় অনুগ্রহে-বস্তুতঃ তৈরী করে রেখেছি কাফেরদের জন্য অপমান জনক আযাব।” সূরা নিসাঃ ৩৬-৩৭।

শ্রমিকদের ক্ষমতার বাইরে তাদের উপর কাজের বোঝা চাপিয়ে দেয়া ঠিক না। তাদের কাজের নিরাপদ পরিবেশ রাখা জরূরী। শ্রমিকেরা আঘাত পেলে তাদের ক্ষতিপুরুনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। এবং তাদের কাজের জন্য নির্দিষ্ট সময় থাকা উচিত।

“আমি মাদইয়ানের প্রতি তাদের ভাই শোয়ায়েবকে প্রেরণ করেছি। সে বললঃ হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর এবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছে তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রমাণ এসে গেছে। অতএব তোমরা মাপ ও ওজন পূর্ন কর এবং মানুষকে তাদের দ্রব্যদি কম দিয়ো না এবং ভুপৃষ্টের সংস্কার সাধন করার পর তাতে অনর্থ সৃষ্টি করো না। এই হল তোমাদের জন্যে কল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।” সূরা আল আরাফঃ ৮৫

যারা মাপে কম দেয় তাদেরকে সতর্ক করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন,
“যারা মাপে কম করে, তাদের জন্যে দুর্ভোগ,যারা লোকের কাছ থেকে যখন মেপে নেয়, তখন পূর্ণ মাত্রায় নেয় এবং যখন লোকদেরকে মেপে দেয় কিংবা ওজন করে দেয়, তখন কম করে দেয়।তারা কি চিন্তা করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে। সেই মহাদিবসে,যেদিন মানুষ দাঁড়াবে বিশ্ব পালনকর্তার সামনে।” সূরা আল মুতাফ্ফিফিনঃ ১-৬
সুতরাং শ্রমিকদেরকেও তাদের মজুরী থেকে যদি বেশি কাজ করিয়ে মজুরী কম দেয়া হয়, তাহলে কাল কিয়ামতের ময়দানে আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সেদিন আল্লাহর আরসের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না।

শ্রমিকদের সঠিক সময়ে তাদের মজুরী দিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে।
“শ্রমিকদের ঘাম শুকানোর পূর্বেই তাদের মজূরী দিয়ে দিও” ইবনে মাজাহ।

শ্রমিকেরা যে পরিশ্রম করে, যে অমানবীয় কষ্ট করে তার প্রতি সম্মান রক্ষা করে, যথাসময়ে তাদের মজুরী দিয়ে দেয়া উচিত। অনেকেই মজুরী দিতে গড়িমসী করে। আবার আমাদের দেশে গার্মেন্টস সেক্টরস গুলোতে খুবই কম মজুরী দেয়া হয়। আল্লাহর কাছে জবাবদিহি থেকে রক্ষা পেতে চাইলে শ্রমিকের মজূরীর ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া জরূরী। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী শ্রমিকদের সাথে আচরন করার তৌফিক দান করুন। (আমীন)

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s