বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের ভবিষ্যৎ এবং আমাদের করনীয়ঃ কিছু প্রশ্ন এবং তার জবাব

এক ভাইয়ের কিছু প্রশ্ন

* পলিটিক্যাল ইসলাম আর ইসলামি আন্দোলনের অন্তর্নিহিত পার্থক্যগুলো বললে প্রস্তাবনা বুঝতে সুবিধা হতো, যেহেতু পরবর্তী রিজনিং গুলো এর উপর ভিত্তি করেই করেছেন।

* দাতাদেশ শব্দটাই বিভ্রান্তিকর। বাংলাদেশ দানের উপর নির্ভরশীল নয়। কিছু বানিজ্যিক ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে অগ্রাধিকার পায়, সেগুলি তুলে নিলে ডেফিনিটলি ঝামেলায় পড়তে হতে পারে। তবে পাশ্চাত্যের ক্ষমতাধর দেশগুলির সাথে ক্যাচালে যাওয়াটা অপ্রয়োজনীয়।

* ইসলামী বিধানের ক্রমবাস্তবায়ন আর আপোষকামীতা দুইটা এক বিষয় না।

* মিশরের মুরসী সরকারের পতনের সাথে দাতা/গ্রহীতার সম্পর্ক ঠিক কতটুকু? এমেরিক্যান এইডের (এর বড় একটা অংশ কন্সালটেন্সি আর ট্রেইনিং আর ইকুইপমেন্ট বাবদ খরচ হয়,যেটা ঐদিকেই ফিরে যায়)পরিমান দেড় বিলিয়ন, সেটা মিসরের জিডিপির ঠিক কতভাগ? মুরসী সরকারের পতন মানেই ইখওয়ানের পতন না। ইখওয়ান এর থেকে বেশি সময় ক্ষমতায় থাকার খুব একটা আশা করেনি বলেই মনে হয়।

* “একটি আধ্যত্নিক দল বা গ্রুপ তৈরী করতে হবে যারা ইসলামের কঠোর বিধি নিষেধ এর উপর নিজেদের কায়েম রাখবে এবং যাদের দায়িত্ব হবে তাক্বওয়াবান মুমিন তৈরীর কাজ করে যাওয়া।”

আহলে হাদীস আন্দোলন বাংলাদেশের ইসলামপন্থী মানুষদের সবচেয়ে বড় যে ক্ষতিটা করেছে তা হচ্ছে বড় একটা জনগোষ্ঠির মাঝে ‘তাকওয়া = কঠোরতা’ এই ধারণাটা বদ্ধমুল করে দেয়া। এই ধারতেই পলিটিক্যাল ইসলাম/ ইসলামি আন্দোলন এইসব বিভাজন তৈরী হয়, এই ধারাতেই ‘রাজনীতি কলুষিত তাই আধ্যাত্নিকতা আর রাজনীতিকে আলাদা করা’র সবক দেয়া হয়, এই ধারাতেই ইসলামের ক্রমবাস্তবায়ন আর আপোষকামিতাকে এক করে ফেলা হয়।
…………………………………………………………——————————————–
এক ভাইয়ের কিছু প্রশ্নের জবাবে আমার উত্তরঃ
ইসলামি আন্দোলনঃ
আমি কোন ফরমাল ডেফিনেশনে না গিয়ে সংক্ষেপে যেটি বলবো সেটি হলো, ইসলামী অনুশাসনকে কায়েম রেখে, বা ইসলামী বিধান সমূহ অক্ষুন্ন রেখে, আল্লাহর সন্তুষ্টির সাথে কোন কিছুকে আপোষ না করে, বা কৌশলের নামে ইসলামের মৌলিক বিষয় গুলোর সাথে আপোষ না করে ইক্বামাতে দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রেচেষ্টা। ইসলামি আন্দোলনকে রাজনীতির সাথে জড়ালেও নিজেদের মধ্যে বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বিদ্যমান দল সমুহের মধ্যে ইসলামী বিধান সমুহের সঠিক বাস্তবায়নের চর্চা অক্ষুন্ন রাখার চেষ্টা করা হয় বা অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

পলিটিক্যাল ইসলামঃ
ইসলামী পলিটিক্স বা অন্য কথায় পলিটিক্যাল ইসলাম বলতে আমার কাছে যেটি মনেহয়, বা বিদ্যমান পলিটিক্যাল ইসলামকে দেখে যা মনেহয় সেটি হলো, ক্ষমতার অর্জনের মাধ্যমে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।
পলিটিক্যাল ইসলাম শব্দটি যখন ব্যবহার করা হয়, তখন সমাজে বিদ্যমান রাজনীতির সাথে কিছুটা আপোষ মূলক চিন্তা মাথায় রাখা হয়, অথবা আধুনিক রাজনীতির কিছু কৌশলকে রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকার জন্য আবশ্যকীয় মনে করা হয়, যদিও তা ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে চলে যায়। এখানে ক্ষমতার আরোহন কে অগ্রাধিকার দিয়ে সমাকের মৌলিক পরিবর্তনের লক্ষ্য রেখে কাজ করা হয়, ফলে পরিকল্পিত রাজনীতি করতে গিয়ে নিজেদের মধ্যে ইসলামী অনুশাসনের ঘাটতিকে সংগঠনের প্রয়োজনে এড়িয়ে যাওয়া হয়, বা প্রয়োজন মনে করা হয়, অথচ ইসলামে অন্যায়কে আপোষ করার হয়ত কোন বিধান নেই। ইসলামী দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচেষ্টা করা যদি মানুষের দ্বায়িত্ব হয়ে থাকে তাহলে সেটিকে যেকোন উপায়ে প্রতিষ্ঠার করার ফলে একটি জিনিস ই মনেহয় সেটি হলো, আমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে দ্বীন ই থাকবেনা তাই আমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে রাজনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে যখন আন্দোলন সংগ্রামে লিপ্ত হই বা রাজনীতির ময়দানে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করতে থাকি তখন একদিকে আমরা মানুষের অধিকার নষ্ট করে থাকি, অপরদিকে আমরা রাজনীতির ময়দানে টিকে থাকার জন্য আল্লাহ ও ইসলামের দুষমনদের সাথে লবিং চালিয়ে যেতে থাকি নিজেদের বৈধতা লাভের আশায়। আল্লার ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের সাথে যখন বিদেশী প্রভূদের ক্ষমতাকে আমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য করে ফলি তখন দীন প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে আল্লাহর দেয়া শর্তকে আমরা হয়ত কিছুটা লংঘন করে বসি।

“দাতা দেশ”
বাংলাদেশের অর্থনীতি স্বয়ংসম্পূর্ন না। বিদেশী বলতে আমি যাদের কাছে সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে অর্থনীতি বা দেশের রাজনীতি সচল থাকে বা পরিচালিত হয় তাদের কথা বুঝাতে চেয়েছি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো পোশাক খাত তাই এই খাতকেই আমি উদাহরন হিসেবে টেনে নিলাম, পোষাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে রপ্তানীর অনেকটাই নির্ভর করে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং অ্যামেরিকার দেয়া বিশেষ সুবিধার উপর। তাছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব বিদেশী গোষ্ঠির প্রভাব দৃশ্যমান। এমনকি ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের জীবন বাচাতে বা ফাসি না দেয়ার জন্য লবিং করা হয়ে থাকতে পারে ( আমি এই বিষয়টি নিশ্চিত না তবে ধারনামতে লবিং করা হয়েছে), এমনকি বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের পথিকৃত জামায়াতে ইসলামী নিজেদের অস্তিত্ব টিকে রাখার জন্য হয়ত লবিং চালিয়ে যাচ্ছে লবিং করা হয়ত সমস্যা না। সমস্যা হলো লবিং করতে গিয়ে যাদের কাছে লবিং করা হচ্ছে তাদের সাথে কোন কিছু আপোষ করা হচ্ছে কিনা, বা তাদের দাবী অনুযায়ী নিজেদের আদর্শের পরিবর্তন না করে, বা ইসলামী অনুশাসনের সবকিছু বিদ্যমান রেখে স্বচ্ছন্দে রাজনীতি করা যাচ্ছে কিনা।

ইসলামী বিধানের ক্রমবাস্তবায়ন এবং আপোষকামীতাঃ
আমি যতটুকু জানি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে পুরাতন দল (বড় দলগুলোর মধ্যে), যার ভিত্তি ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। দলগঠনের এতো গুলো বছর পার করার পরে দলের অনেক নেতা কর্মীর মধ্যে ইসলামের মৌলিক ত্রুটি বিদ্যমান। প্রতিষ্ঠার এত বছর পরও একটি দলের মধ্যে যখন এরকম ত্রুটি বিদ্যমান তখন সে দলের জন্য রাজনীতির ক্ষমতা অর্জনকে অগ্রাধিকার দেয়া কতটুকু ইসলাম সম্মত বা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? এটি হয়ত বলা যেতে পারে যে মানুষের মধ্যে ত্রুটি থাকবে, এসব থাকবে এসব নিয়ে চলতে হবে, কিন্তু বাস্তবে কি তাই? সংগঠনের সংকটকালে আমরা মক্কার জীবনের সাথে তুলনা করি অনেক সময়, কিন্তু মক্কার জীবনের ইসলামের প্রাকটিসের মাধ্যমে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার ততকালীন কর্মীদের নিজেদের তৈরীর যে কঠোর অনুশীলন সেটি হয়ত কথার মধ্যে অনুপস্থিত থাকে। ঈমানী ও চারিত্রিক ভাবে অপূর্ণ থেকে ক্ষমতা অর্জনের জন্য সংগ্রাম লড়াই করলে বা লড়াই করে ক্ষমতা অর্জন করলে ইসলামী আইনের বাস্তবায়ন কি এতোদিন ধরে চলে আসা সিস্টেমের মধ্যে গড়ে ওঠা মানুষগুলো দ্বারা সম্ভব? হয়ত কিছুটা সম্ভব কিন্তু পুরোপুরি কি সম্ভব? যদি পুরোপুরি সম্ভব নাই হয়, তাহলে এটাই কি শ্রেয় না যে, যারা ইসলামী আন্দোলনকে জীবনের লক্ষ্য করে নিয়েছে আগে তাদের মধ্যে ইসলামের কঠোর অনুশীলনের নিশ্চিত করা। হয়ত বলা হতে পারে যে, এখন কি সেটা নেই, আমি যতটুকু সংগঠনকে দেখেছি বলবো যে নেই, অনেক ত্রুটি বিদ্যমান। তখন হয়ত বলা হবে যে, মানুষ হিসেবে ত্রুটি থাকবেই বা আগে এরকম ছিলো কিন্তু এটাই বলে কি পাড় পাওয়া যাবে নাকি এসবের জন্য বাস্তব সম্মত ব্যবস্থা থাকতে হবে। যদি প্রশ্ন করেন যে আছে কিনা আমি বলব হয়ত আংশিক আছে তবে যেভাবে মনিটরিং হওয়া দরকার সেভাবে নেই।
যদি প্রশ্ন করেন যে তাহলে কিভাবে এসব মনিটরিং করা যেতে পারে বা এসব থেকে পরিত্রান পাওয়া যেতে পারে তাহলে বলব, যে সাথী সদস্য হওয়ার জন্য অনেক কঠিন ব্যবস্থা করা দরকার, বা সাংগাঠনিক কাজের চেয়ে ইসলামী আমালিয়াতকে বেশি গুরত্ব দেয়া দরকার।
কিছু উদাহারন দেয়া যেতে পারে আমি কেন এরকম ভাবছি,
যেমন যেসব ছাত্রদের রেজাল্ট ভালো তাদের জন্য সংগঠনে অনেক ছাড় দেয়া হয়,
প্রশ্ন হলো কেন দেয়া হয়?
উত্তর আসবে সংগঠনে ভালো লোক দরকার। তাহলে এখানে সংগঠন গুরুত্বপেলো নাকি ইসলাম গুরুত্ব পেলো। যদি বলেন যে ছেলেটি তো নামাজ কালাম পড়ে, অনেক উদাহরন দেয়া যেতে পারে যেখানে অনেক ঘাটতি থাকার পর অনেক ছাড় দেয়া হয় শুধু সংগঠনের লাভের জন্য। আমি শুধুমাত্র একটি উদাহরন দিলাম, এরকম আরো কিছু দেয়া যেতে পারে যেগুলো করা হয় সংগঠনের লাভের জন্য। কথা হলো যে সংগঠনের উদ্দেশ্য হলো দ্বীন প্রতিষ্ঠা সেখানে এগুলো করে কি এটা মনে করা হয় না?যে এগুলোর না হলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব না, বা রাজনীতিতে সুবিধা করা সম্ভব না। যদি তাই মনে করা হয়, তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টির স্থান টি কোথায়?
একারনেই আমি মনে করি ক্রমবাস্তবায়নের যে কথা সেটি অনেকটাই একটি অবাস্তব কথা।

মিশর বা ইখওয়ানঃ
আমি ইখওয়ানের কথা হয়ত সরাসরি বলিনি তবে মিশরের কথা বলেছিলাম। মিশরের সরকার বা মুরসি সরকার অবশ্যই ভালো উদ্যেগ নিয়েছিলো। কিন্তু সেই উদ্যেগের স্থায়িত্ব খুবই কম হয়েছে। এটি হয়েছে বিদেশী শক্তির অসহযোগিতা বা বিরোধিতা এবং দেশের ভেতরে বা সরকার পরিচালনার সিস্টেমের মধ্যে থাকা ইসলাম বিরোধী বা ইসলামী আইন প্রতিষ্ঠার বিরোধী গোষ্ঠির কারনে। ইলেকশনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহন করার পরো যেখানে টিকতে পারেনি সেখানে বাংলাদেশের মত একটি রাষ্ট্রে সেটি কতটুকু সম্ভব। এটিই বুঝাতে চেয়েছিলাম। তবে আমি এটি বলছি না যে ইসলামি আন্দোলন করা যাবে না। আমার কথা হলো, যখন নিজেদের ভেতর অনেক সমস্যা তখন সেটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সামনে অগ্রসর হওয়া।

ইসলামে আধাত্নিক দল বা গ্রুপঃ
এটি বলেছিলাম কারন, হলো ইসলামের মূল স্পিরিট কে টিকিয়ে রাখতে হলে, ইসলামী নলেজের পারদর্শী বা নলেজের চর্চাকারী একটি গ্রুপ বা দল থাকতে হবে, যারা ইসলামের দাওয়াতের প্রসারে কাজ করবে।
এটি বলার কারন, সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা রাজনীতি করতে ভয় পায় কিন্তু তারা ইসলাম পছন্দ করে ইসলামের চর্চা করতে ভালোবাসে এসব মানুষকে সঠিক পথে রাখার জন্য কিংবা নিজেদের আয়ত্বের মধ্যে রাখার জন্য দাওয়াতী দল বা একই দলের ধর্মীয় শাখা রাখা যেতে পারে। তাতে করে সকল মানুষের কাছে ইসলামকে পৌছানো যাবে। বিদ্যমান সংগাঠনিক ব্যবস্থায়, ইসলামের বব্যাপক দাওয়াতী কাজ করা সম্ভব হয় না। সাংগাঠনিক/রাজনৈতিক কাজে বেশি মনোনিবেশ করার ফলে দাওয়াতী কাজ বা সমাজে ইসলামের প্রসারে যেভাবে কাজ হওয়ার কথা সেভাবে হচ্ছে না, ফলে অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের ফলে বা নিজেদের অবস্থা স্বচ্ছল হওয়ার ফলে মানুষ উন্মুক্ত চিন্তার অধিকারী হয়ে, সমাজে সহজলভ্য শিক্ষাকে গ্রহন করছে ফলে মানুষের চিন্তার বিকাশও সেভাবে হচ্ছে। ফলে সমাজের একটি বৃহত অংশ ইসলামী চিন্তার বদলে ইসলাম বিরোধী চিন্তায় বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। যদি ইসলামী শিক্ষার প্রসারে ব্যাপক কাজ করা যেত এই সংখ্যা অনেকটা কমে যেত।

আমি যেভাবে বুঝেছি, বা আমি যা বলতে চেয়েছিলাম, সংক্ষেপে এটিও তার ব্যাখ্যা।
ধন্যবাদ আপনাকে সময় করে পড়ার জন্য।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s