বাংলাদেশে ভারতীয় হস্তক্ষেপঃ সমকালীন ভাবনা

মানুষের বড় হওয়ার আকাংখা একটি জন্মগত স্বভাব। সমাজে ক্ষমতা, প্রতিপত্তি, নাম ও যশ অর্জন যেমন একটি চিরন্তন বাসনা, নিজেকে অপরের কাছে ক্ষমতাধর বা যোগ্যতা সম্পন্ন প্রমান করার অবিরাম চেষ্টা যেমন একটি প্রানীসুলভ আচরন। ঠিক তেমনি একটি রাষ্ট্রের ও স্বভাব হলো নিজেকে পাশের রাষ্ট্রের কাছে ক্ষমতাবান প্রতিয়মান করা, নিজেকে মোড়লসুলভ করে তোলা, নিজেকে রাজাসুলভ করে গড়ে তোলা বা প্রমান করা। রাষ্ট্রের এমন স্বভাব তৈরী হয় কারন এই রাষ্ট্রটি পরিচালনা করে মূলত প্রানীকূলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ জাতি। আর মানুষ এই গুনতি অর্জন করে প্রকৃতি থেকে। সুতরাং সে হিসেবে বলা যায়, রাষ্ট্রে শ্রেষ্ঠ হওয়ার বাসনা একটি প্রকৃতিগত স্বভাব। কারন যা কিছু প্রাকৃতিক তার মধ্যে মূলত শক্তিমানদের শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষনা করা হয়েছে। ফলে বনের পশুরা যেমন একে অপরকে শিকার করতে সর্বদা ফাদ পেতে বসে থাকে তেমনি একই প্রকৃতির মনুষ্য তৈরী রাষ্ট্রনামক যন্ত্রটিও পাশের রাষ্ট্রের সাথে বা বিদ্যমান রাষ্ট্রসমুহের সামনে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমানে সদা সচেষ্ট থাকে। আর এই শক্তি প্রদর্শনের মহড়া চলে মূলত নিজের চেয়ে দূর্বল রাষ্ট্রের সামনে।
দূর্বলরা যেমন শিকারে পরিনত হওয়ার ভয়ে সর্বদা সতর্ক থাকে ঠিক তেমনি একটি দূর্বল রাষ্ট্রের ও উচিত সদা সতর্ক থাকা নয়ত শিকারে পরিনত হয়ে, বড় রাষ্ট্রের উদরে ভরে যাওয়ার সমুহ সম্ভাবনা থাকে। মানুষ বা প্রানী দূর্বল হয় তখনি যখন তার অংগ সমুহ দূর্বল ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে, যখন তার স্বাভাবিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াগুলো লোপ পায়। ঠিক তেমনি একটি রাষ্ট্রের ও কিছু অংগ প্রতাংগ থাকে যেগুলো নষ্ট হয়ে গেলে রাষ্ট্র হিসেবে দূর্বল হয়ে পড়ে, ফলে অন্যের শিকারে পরিনত হয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্র নিজের অস্তিত্বের সংকটে পরে।

সমসাময়িক বাংলাদেশের ঘটনাবলী এবং ভারতে চলাফেরা ও আচরন বাংলাদেশের মানুষের কাছে অন্তত এটি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব বলতে জীবন আজ হুমকীর সম্মুখীন। যারা এখনও হুমকী মনে করতে পারছে না, তাদের নিজেদের কলকব্জা এমন হয়ে গেছে যে নিজেদের বোধশক্তিও হারিয়ে ফেলেছে। আর রাষ্ট্রের সার্ব্যভৌমত্বের এই হুমকী তৈরী কি এমনি এমনি হয়েছে? এটি হয়েছে মূলত রাষ্ট্রের চালকের অসতর্কতা এবং তার যাত্রীদের ঘুমিয়ে পড়ার কারনে। মানুষের শরীরের জন্য যেমন একজন পরিচালক দরকার, ট্রাকের জন্য যেমন একজন ড্রাইভার দরকার, তেমনি রাষ্ট্র নামক একটি শরীরকে পরিচালনার জন্য ও ড্রাইভারের দরকার হয়, আর এক্ষেত্রে রাজনীতিবিদরা ড্রাইভারের ভূমিকা পালন করে। একজন জুয়ারূ যখন জুয়ার নেশায় পেয়ে বসে তখন সে নিজের বউকেও বিক্রি করে দেয়, নিজের মেয়েকে তুলে দেয় পর পুরুষের কাছে। কারন তখন তার নেশাকে আপন মনে হয়। রাজনীতি যখন কলুষিত হয়, রাজনীতিবিদরা যখন আদর্শহীন হয়ে পড়ে, যখন তারা ক্ষমতার নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে তখন তা রাজনীতির জন্য, সমাজ ও দেশের জন্য ভয়ানক হয়ে উঠে। শুরু হয় নিজেদের নেশাকে বাচানোর প্রানপন লড়াই। ফলে রাষ্ট্রনামক যন্ত্রটির কলকব্জা একে একে নষ্ট হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র অকেজো হয়ে পড়ে, তখনই তা হয়ে যায় অন্যের অধীন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পূর্ব এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি জিনিসই দেখা যায়, অন্তত আমি দেখতে পাই। আর তা হলো, উভয় কালে আওয়ামীলীগের প্রতি ভারতের অকুন্ঠ সমর্থন এবং উভয় কালে ভারতের প্রতি জামায়াতের প্রচন্ড বিরোধিতা। এই দুটি কথা উল্লেখ করলাম কারন হলো এই দুটিকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস আবর্তিত হচ্ছে। জামায়াত যেমন বাংলাদেশের কখনই বিরোধীতা করেনি, ঠিক তেমনি আওয়ামীলীগ কখনই ভারতের বিরোধীতা করেনি। তাহলে জামায়াতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ঘৃণা কিভাবে জন্মালো?
বাংলাদেশ সৃষ্টিতে যেমন ভারতের অবদান, জামায়াতের বিরোধিতাও ঠিক তেমনি ভারতের অবদান। জামায়াত যেমন তার দুরদৃষ্টি দিয়ে ভারতের বিরোধিতা করে আসছে, ঠিক তেমনি ভারত তার দুরদৃষ্টি দিয়ে জামায়াতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষকে বিষিয়ে তুলেছে, মানুষের মধ্যে জামায়াতকে নিয়ে সন্দেহের বীজ বপন করে এখন সেটার ফল তোলা শুরু করে দিয়েছে। শেখমুজিবের হত্যাকান্ডে যেমন ভারতের মদদ আছে ঠিক তেমনি প্রচন্ড জাতিয়তাবাদের চেতনায় উজ্জিবীত জিয়াউর রহমানের হত্যায় ও এই ভারত জড়িত। ভারত এসব করছে তার অনেক দিনের পরিকল্পনা করে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই মূলত বাংলাদেশে ভারতে বিরোধী বুদ্ধিজীবিদের ১৯৭১ সালে ভারতের “র” এর প্রত্যক্ষ মদদে হত্যা করা হয়।
ফলে বাংলাদেশ হয়ে পড়ে নেতাহীন এক রাষ্ট্রে, তখন থেকে ভারত তার গন্তব্য পথে হাটছে অতিসমর্পনে। সমসাময়িক বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি লক্ষ্য করলে দেখা যায় রাজনৈতিক আদর্শের মৃত্যুর ফলের বিএনপি এবং আওয়ামীলীগ যখন ভারতের “র” এর হাতে বন্দী তখন সেই জামায়াত বাংলাদেশের মানুষের ত্রান কর্তার ভূমিকায় আবির্ভুত হয়ে আওয়ামী , বিএনপি ও ভারত সবার মাথা ব্যাথার কারন হয়ে দাড়িয়েছে। কারন
আদর্শিকভাবে জামায়াতই একমাত্র দল যে টিকে আছে। এবং জামায়াতের সমসাময়িক আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের কাছে জামায়াতের গ্রহনযোগ্যতা যেমন অনেকাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে, ঠিক তেমনি আওয়ামীলীগকে একটি সন্ত্রাসী এবং দেশের স্বার্থ বিরোধী দল হিসেবে মানুষ ভাবা শুরু করে দিয়েছে। অপরদিকে ভারতের “র” এর টাকায় বন্দি বিএনপির কিছু নেতার কারনে বিএনপি রাজনৈতিক ভাবে শক্তিহীন দল হিসেবে মানুষের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে।
ফলে মানুষ যখন জামায়াতকে সম্ভাব্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা শুরু করে দিয়েছে, তখন ভারত এটি বুঝতে পেরেই একদিকে যেমন আওয়ামীলীগকে অকুন্ঠ সমর্থন দিচ্ছে অপরদিকে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়া করে মূলত বাংলাদেশের সার্ব্যভৌমত্বের পথে সকল বাধাকে পরিষ্কার করতে সচেষ্ট রয়েছে। অপরদিকে ক্ষমতার নেশাগ্রস্থ আওয়ামীলীগ দেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে ক্ষমতায় থাকার স্বপ্ন দেখছে। অথচ সত্য এটি ই যে, যদি ভারত কখনও বাংলাদেশের উপর খবরদারি করার সুযোগ পায় তাহলে আওয়ামীলীগের সাথে বন্ধুত্ব না রেখে জামায়তের সাথেই রাখবে, কারন নতুন বাংলাদেশে আওয়ামীলীগ রাজাকার হয়ে যাবে, ইতিহাসের পূনরাবৃত্তিতে আওয়ামীলীগকে থুথু দিবে আর জামায়াতকে অকুন্ঠ সমর্থন দিবে।
তবে জামায়াতকেও এর জন্য তাদের পলিসির অনেক পরিবর্তন করতে হবে। রাজনীতির পলিসীকে রাজনীতিকরন করে, জামায়াতকে একটি ইসলাম পন্থি দল হিসেবে রেখে রাজনীতির ময়দানে ক্ষমতার লড়াইয়ে মানুষকে কাছে টানার জন্য তাদের পরিচ্ছন্ন ইয়ং লিডার দের দিয়ে একটি রাজনৈতিক দল বা জামায়াতের রাজনৈতিক শাখা তৈরী করা গেলে সেটিই হবে আধুনিক বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল।
ঘটনা যাই হোক, বাংলাদেশের বিদ্যমান অবস্থা পরিবর্তন সহসাই হচ্ছে না। দু-ভাবে বিদ্যমান অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে,

একঃ ভারত যতক্ষন পর্যন্ত তার স্বার্থের ব্যাপারে বিএনপি এর কাছে অকুন্ঠ সমর্থন পাচ্ছে ততক্ষন পর্যন্ত অবস্থা জটিল ই থাকবে। বিএনপির সমর্থন বলতে
১) আওয়ামীলীগ যত চুক্তি করেছে তা বাতিল না করা,
২) আওয়ামীলীগের উপর দমনমূলক আচরন না করার কথা আদায়।
৩) জামায়াতকে ত্যাগ করে জামায়াত নেতাদের ফাসির বিষয়ে কথা দেয়া।
বিএনপি এগুলো কথা দিলে ভারত নতুন নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দিবে, ফলে আওয়ামীলীগের চলে যাওয়া হবে নিরাপদ, ভারত তার স্বার্থ্য রক্ষা করতে পারবে, তার বন্ধুকে বাচাতে পারবে। ভবিষ্যত জামায়াতের শক্তিকে বিএনপির দ্বারা ধ্বংস করতে পারবে।

দুইঃ বিএনপিকে বাংলাদেশের সমগ্র মানুষকে সাথে নিয়ে আন্দোলনে নেমে আওয়ামীলীগকে ক্ষমতা থেকে নামতে বাধ্য করার পাশাপাশি পশ্চিমাবিশ্বের কাছে একটি জাতিতে পরিচালনার নিজেদের শক্তি ও নিজেদের প্রতি মানুষের ব্যাপক সমর্থনের বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।

এই দুটির একটিও না হলে, দেশ একটি অজানা গন্তব্যে যাবে। দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখা বিভিন্ন সেক্টর ভারত কৌশলে নিয়ে নিবে, বাংলাদেশকে আরো নির্ভরশীল রাষ্ট্রে পরিনত করতে সচেষ্ট থাকবে।

তবে কি হবে সেটি নির্ভর করছে, স্বাধীনচেতা ১৬ কোটি লড়াকু বাংলাদেশী মানুষের উপর। যারা নিজেদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে লড়াই করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে চলছে সামনের দিকে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s