সুইডেনে ইসলাম ভীতিঃ ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা

১৬ শতকের মধ্যভাগের দিকে সুইডেন আনুষ্ঠানিকভাবে ক্যাথোলিক থেকে লুথারান প্রোটেষ্ট্যান্ট দেশে পরিণত হয়। সেসময় ল্যাটিন খ্রীষ্টিয় বিশ্বে ইসলামকে নেগেটিভ ভাবে উপস্থাপন ছিলো খুব জনপ্রিয়, সেসময় ইসলাম এবং মুহাম্মদ (সাঃ) কে খুবই বিকৃতভাবে খ্রীষ্ট সমাজে উপস্থাপন করা হয়। ইসলামকে চিত্রিত করা হয় একটি, নিষ্ঠুর, আক্রমনাত্নক, মারাত্নক ধর্ম হিসেবে আর মুহাম্মদ (সাঃ) কে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়। তবে সেসময় ম্যাক্সিম র‍্যাডিনসন মত ঐতিহাসিক গন পজিটিভভাবে ইসলাম এবং মুহাম্মদ (সাঃ) কে উপস্থাপনের চেষ্টা করে।

তবে ইসলামকে নিয়ে বিকৃত উপস্থপনা সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে পড়ে সুইডেনের চার্চগুলোর মাধ্যমে। মুহাম্মদ (সাঃ) কে কিভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরা তার উদাহরন পাওয়া যায় ১৬ শতকের মধ্যভাগের একটি চার্চের দেয়ালের পেইন্টিং থেকে। এই চার্চটি গোথেম চার্চ নামে পরিচিত যেটি গোটল্যান্ডে অবস্থিত। গোটল্যান্ড হলো সুইডেনের একটি দ্বীপ যেটি সুইডেনের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত। সেই পেইন্টিং দেখানো হয় সেইন্ট ক্রিস্টোফার শিশু যিশুকে রক্ষা করছে পানি থেকে যেখানে পোপ এবং মুহাম্মদ (সাঃ) মৃত অবস্থায় দেখানো হয়েছে। এই পেইন্টিং আমরা কি বুঝতে পারি? এ ধরনের প্রপাগান্ডা মূলত ক্যাথোলিক পোপের নেতৃত্বাধীন চার্চের বিশ্বাসকে নির্দেশ করে। এই পেইন্টিং এ রাসুল মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে অজ্ঞাত পোপকে অপমান করা হয়েছে। পোপের সাথে ইসলামকে জড়ানো সেসময়ে একটি প্রথায় পরিনত হয়েছিলো। যখন ই চার্চ এবং খ্রীষ্টান ধর্মের বিরুদ্ধ কিছু চিত্রিত করা হত তখন ই পোপ এবং ইসলাম কে একসাথে দেখানো হত। এরকম ই একটি উদাহরন পাওয়া যায়, ১৬০৯ সালে ক্যাসপার মেলিসান্ডার এর প্রার্থনা বইয়ে যা শিশুদের জন্য লিখা হয়েছিলো। ঐ বইয়ের একটি প্রার্থনায় লিখা ছিলো “Sweet Lord Jesus Christ, keep us from the Turk, the Tattar, the Pope and all
sects”। ইসলামের উত্থানকে অন্যান্যদের জন্য ধ্বংসস্বরূপ এটি এখনও সুইডেন এর কিছু ফ্রি চার্চে দেখানো হয়।

১৬৩৪ সালের সংবিধানে ধর্মীয় ঐক্যকে সুইডেনের উন্নতির জন্য খুবই গুরত্ব হিসেবে ঘোষনা করা হয়। এটি ১৭ শতকে পর্যন্ত আরো কিছু ডিক্রির মাধ্যমে বলবত করা হয়।, যেমন ১৬৬৫ সালে লুথারিজম ছাড়া অন্য ধর্ম চর্চাকে বেআইনি করা হয়। ১৭৭৪ সালে ধর্ম ত্যাগীদের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে নির্বাসন কে আইন করা হয়। ১৬৮৬ সালের আইন অনুযায়ী একজন ধর্মত্যাগীকে কখনই সুইডিশ হিসেবে বিবেচনা করা হবেনা এবং তাকে দেশ ত্যাগ করতে হবে, অধিকন্তু চার্চের ধর্ম চর্চাকে নাগরিকত্বের একটি শর্ত হিসেবে গন্য করা হত।

অটোমান শাসকদের প্রতি আকর্ষনঃ
১৭ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে এং ১৮ শতকের শুরুতে যখন সুইডেন রাজনীতিতে আসে তখন রাজা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ভিন্ন এজন্ডা গ্রহন করে। যখন সুইডেনে রাজনৈতিক ক্ষমতা আসে তখন সুইডেনের একমাত্র প্রতিদ্বন্দী ছিলো রাশিয়া। আর তখন ইউরোপে রাশিয়ার সমকক্ষ বলতে একমাত্র অটোমান রাজ্য। ইতোমধ্যে ১৬৫৭ সালে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সমর্থন লাভের জন্য রাজা কার্ল ১০ম গুস্তাভ ইস্তান্বুলে একজন রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করেন। অটোমান শাসকদের সাথে সুইডেনের সম্পর্ক যে গুরত্বপূর্ণ ছিলো সেটি বুঝা যায় ১৮ শতকে, যখন কার্ল ১২ গুস্তাভ ১৭০৯ সালে পলতোভায় রাশিয়ান আর্মিদের সাত চরমভাবে পরাজিত হয়। তখন সুইডেনের রাজা দেশে প্রত্যাবর্তনের আগে ৫ বছর অটোমান শাসকদের হেফাজতে ছিলো। ১৮ শতকে অটোমান শাসকদের সাথে সুইডেনের সম্পর্ক চলতে থাকে। সুইডেনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ অটোমান সভ্যতার প্রসংশা শুরু করে এবং সুইডেনে তুর্কি বা পার্সি শেখাকে উতসাহিত করা শুরু করে। ফলশ্রুতিতে সুইডেন ইস্তান্বুলে একটি এ্যাম্বাসী স্থাপন করে। ফলে সুইডেনে ইসলাম একটু ভিন্নভাবে উপস্থাপন শুরু হতে থাকে। আগে যেখানে ইসলামকে ধ্বংসাত্নক হিসেবে দেখানো হত সেখানে মানুষকে টার্কিশ প্রথা এবং আচরনে অভ্যস্থ হতে দেখা যায়। ফলে মানুষের মধ্যে ইসলাম ধর্মের প্রথা এবং ধর্মতত্ত্বের উপর আগ্রহ তৈরী হতে থাকে।

১৮ শতকের শুরুতে ক্ষমতার সম্পর্ক ছিলো অনস্বীকার্য, সুইডেন এমন একটি অঞ্চলে ছিলো যে, অটোমান শাসকদের সমর্থন তাদের প্রয়োজন ছিলো, সেখানে অন্য কোন উপায় ছিলোনা। খুব ই দ্রুত সুইডেন অটোমান শাসকদের প্রতি ঋনী হয়ে পড়ে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক অটোমান শাসকদের সুইডেনের প্রতি আগ্রহী করে তুলে। মজার বিষয় হলো এসব কিছুতে প্রভাবান্বিত হয়ে কার্ল ১২ গুস্তাভ ব্যতিক্রমী এক ডিক্রির মাধ্যমে দেশে চালিত এতোদিনের আইনের পরিবর্তন আনেন। যেসব মুসলিম এবং ইহুদী ১৭১৮ সালের দিকে অটোমান রাজ্য থেকে সুইডেনে আসে তারা নিজেদের ধর্ম পালনের নিশ্চয়তা লাভ করে।
আর এই ব্যতিক্রমের ফলে ধারাবাহিকভাবে আরো অনেক ব্যতিক্রমের সূচনা করে, যার ফলে বুদ্ধিজীবি সমাজের মধ্যে সংখ্যালঘু শ্রেনীর ধর্ম ও প্রথা নিয়ে আগ্রহের সৃষ্টি হয়।

চলবে——————-এরপর বিংশ শতাব্দীর আলোচনা।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s