কবিরাহ গুনাহঃ গীবত

সকল প্রশংসা আল্লাহর। রাসুল (সাঃ) ও তার পরিবার এবং তার সাহাবীদের উপর আল্লাহর শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক।

“আল্লাহকে ভয় কর এবং তার আনুগত্য কর। ভয় কর সেদিনের যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। সেদিন প্রত্যেক মানুষকে তার অর্জিত আমল থেকে পরিশোধ করতে হবে এবং কারো উপর অবিচার করা হবে না।” (সুরা আল-বাকারা, ২:২৮১)

কবিরা গুনাহ ই প্রকৃতপক্ষে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল দুর্বিপাক, মন্দ, পীড়ন এবং অদ্যাবধি সকল ক্ষতির কারণ হতে পারে. এবং সমস্ত পাপের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হলো সেই সব যা ক্ষতি এবং বিপদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। ধ্বংসাত্মক প্রধান পাপের মধ্যে গীবত এবং অপবাদ দেয়া অন্যতম। এ দুটি পাপ আল্লাহ তাঁর নবীর মাধ্যমে নিষিদ্ধ করেছেন কারণ তারা ঘৃণা, খারাপ এবং মানুষের মধ্যে অনৈক্য বপন করে এবং যা ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। তারা একই পরিবারের লোকেদের মধ্যে এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে এবং আত্মীয়ের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষের সৃষ্টি করে। তারা ভাল কাজের হ্রাস এবং মন্দ কাজে বেশী বৃদ্ধি করে যা তাদের অসম্মান ও অপমানের দিকে নিয়ে যায়।

গীবত এবং অপবাদ হলো এক ধরনের অপমান ও বেইজ্জতি। এসবের পৃষ্ঠপোষক ঘৃণিত এবং তার কখন ই সন্মানজনক মৃত্যু হবে না।আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এই ধরণের কাজ করতে নিষেধ বলেছেন,

“হে বিশ্বাসীগন ! অধিক সন্দেহ পরিত্যাগ করো, নিঃসন্দেহে কিছু সন্দেহ পাপ। গুপ্তচরবৃত্তি এবং একে অপরের কুত্সা রটনা করনা। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু। (আল হুজুরাত, ৪৯: ১২)

এই আয়াতে আল্লাহ কঠোরভাবে গীবতকে নিষিদ্ধ করে বলেছেন গীবতকারী তারাই যারা তার মৃত ভাইয়ের মাংস খায়। যদি সে তার মৃত ভাইয়ের মাংষ খাওয়া ঘৃণা করে, তবে জীবিত ভাইয়ের মাংস খাওয়া ও তার ঘৃনা করা উচিত, যেটা সে করে গীবত এবং কুতসা রটনার মাধ্যমে।

যখন কেউ গভীরভাবে এটি অনুধাবন করতে পারবে তখন নিজেকে গীবত থেকে দুরে রাখতে এটাই তার জন্য যথেষ্ঠ হবে ।

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে নবী বলেন,

“তোমরা কি জান গীবত কি?” তারা বলল, “আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল ভাল জানেন.” তিনি বলেন, “এটা হলো তোমরা তোমাদের ভাই সম্পর্কে যা কিছু বলো যেটা সে অপছন্দ কর।একজন তাকে জিজ্ঞেস করলো, “কিন্তু আমি যদি সত্য বলি? “আল্লাহর রাসূল বলেন,” যদি তুমি তার সম্পর্কে যা বলো তা সত্য হয়, তাহলে তুমি তার গীবত করলে, কিন্তু যদি এটি সত্য না হয় তাহলে তুমি তাকে অপবাদ দিলে. “(মুসলিম)

আবু বকর (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) কুরবানীর (যুল-হজ্জ এর ১০ ম দিন) দিনে মিনায় বলেছিলেন যে,

“নিশ্চয়, তোমাদের রক্ত, সম্পদ এবং সম্মান আজ থেকে একে অপরের নিকট পবিত্র ” (বুখারী এবং মুসলিম)

সাহল ইবন সা´দ হতে বর্ণিত যে আল্লাহর রাসূল বলেন,

“যে তার জিহ্ববাকে অন্যায় কথা থেকে এবং নিজেদের গোপন অঙ্গকে অবৈধ যৌন ক্রিয়া হতে রক্ষা করে আমি তাকে জান্নাতে প্রবেশের ব্যাপারে নিশ্চয়তা প্রদান করছি।” (বুখারী এবং মুসলিম)

আবু-মুসা আল আশয়ারী (রাঃ) বলেন

” আমি আল্লাহর রাসুল (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করলাম “কে সবচেয়ে উত্তম মুসলিম? রাসুল (সাঃ) উত্তরে বললেন, ” যার জিহ্ববা এবং হাতের অনিষ্ঠ থেকে অপর মুসলিম নিরাপদ” (মুসলিম)

আমাদের জিহ্ববার স্খলন বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিৎ। আমাদের জিহ্বাকে মুক্ত হতে বাধা দেওয়া উচিৎ কারন এরকম জিহ্বা তার মালিককে শুধু ক্ষতি আর ধ্বংস এবং বিপর্যয় ই এনে দিতে পারে।
আবু সাঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে আল্লাহর রাসূল বলেন,

“যখন সকালে মানুষ ঘুম থেকে জেগে উঠে তখন তার দেহের সমস্ত অংশ জিহ্বাকে সতর্ক করে বলে, ‘আল্লাহকে ভয় কর ‘”তিরমিযী)

মুয়ায ইবন জাবাল (রাঃ) বলেন,

” হে আল্লাহর রাসূল আমাকে এমন একটি কাজ বলুন যা আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে এবং দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবে। রাসুন (সাঃ) বললেন তুমি একটি অনেক কঠিন বিষয়ে প্রশ্ন করেছ, তবে এটা খুব ই সহজ আল্লাহ যাদের জন্য সহজ করেন। তুমি শুধু আল্লাহর ইবাদাত করবে কাউকে শরীক করবেনা, সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে , রমযান মাসে রোজা রাখবে এবং যদি তোমার সামর্থ্য থাকে হজ্জ করবে। তিনি আরো বলেন, “আমি কি তোমাকে ভালোর প্রবেশদ্বার দেখাব? রোযা হচ্ছে ঢালস্বরুপ (শয়তান থেকে), যাকাত পাপকে ধ্বংস করে যেমন পানি ধ্বংস করে আগুনকে। এবং মধ্যরাতের ইবাদাত তখন তিনি কুরআনের আয়াত উচ্চারন করেন, “তাদের পার্শ্ব শয্যা থেকে আলাদা থাকে। তারা তাদের পালনকর্তাকে ডাকে ভয়ে ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করে। কেউ জানে না তার জন্যে কৃতকর্মের কি কি নয়ন-প্রীতিকর প্রতিদান লুক্কায়িত আছে। (সূরা আস-সাজদাহ, ১৬-১৭) , তারপর আল্লাহর রাসূল (সাঃ) বলেন,’ আমি কি বলব যে বিষয়টির মুখ্য জিনিস এর স্তম্ভ এবং এর মাথা কি?´ আমি বললাম হ্যাঁ আল্লার রাসুল, তখন তিনি বললেন, “বিষয়টির মাথা হচ্ছে ইসলাম, এর স্তম্ভ হচ্ছে সালাত এবং এর শিখর হচ্ছে আল্লাহর পথে জিহাদ.’ তারপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি কি বলবো যে সমস্ত জিনিসের ভিত্তি কি? আমি বললাম: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল. ´তখন তিনি তাঁর জিহ্বা হাতে ধরে বললেন এটাকে ভেতরে রাখ। আমি তাকে বললাম: হে আল্লাহর রাসূল, আমরা কি দ্বায়ী হতে যাচ্চ্ছি যা আমরা উচ্চারন করেছি তার জন্য? তিনি বলেন, ‘তোমার মা কি তোমাকে আবার গর্ভে নিতে পারবে? তাদের মুখে কি তাদের মুখের কথিত আছে ফায়ার ছাড়া কোনো কিছু ঢালাই মানুষ আছে?’ “(তিরমিযী)

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত যে আল্লাহর রাসূল বলেন,

“যখন আমি জান্নাতে আরোহন করলাম, আমি কিছু লোককে অতিক্রম করলাম যাদের নখগুলো ছিলো কপারের (ধাতব) যার দ্বারা তারা নিজেদের মুখে ও বুকে আচড় কাটছিলো এবং আমি বললাম ও জিব্রাইল (আঃ) “এ লোকগুলো কারা?” তিনি বললেন এই লোকগুলো হলো তারা যারা নিজেদের ভাইদের মাংস খাইত, এবং অন্যোর সন্মাতে আঘাত করত” (আবু দাউদ)

সুতরাং গীবতের চর্চা করোনা. আল্লাহ বলছেন, ”

“যখন তোমরা একে মুখে মুখে ছড়াচ্ছিলে এবং মুখে এমন বিষয় উচ্চারণ করছিলে, যার কোন জ্ঞান তোমাদের ছিল না। তোমরা একে তুচ্ছ মনে করছিলে, অথচ এটা আল্লাহর কাছে গুরুতর ব্যাপার ছিল।”(একটি নূর-24: 15).

আবু বকর (রাঃ) তার জিহ্বা হাতে নিয়ে নিতেন এবং বলতেন যে এটি আমার ধ্বংসের কারন হবে। তিনি বলেন এটি বিণয়ের প্রতিক।.

গীবত এত ব্যাপক যে এটি এখন মানুষের মিটিং এর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, মানুষ এখন এটিকে তাদের রাগ ও ঈর্ষা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে তাদের সাথে যারা এটি বিশ্বাস করে যে তারা তাদের নিজস্ব দূর্বলতা গোপন করতে এবং অন্যদের ক্ষতি করতে এটি করছে। তারা এটি ভূলে যায় যে তারা শুধু নিজেদের ই ক্ষতি করে। কারণ গীবতকারী এবং ক্ষতিগ্রস্থ দুজনকেই কিয়ামতের দিন আল্লার সামনে হাজির করা হবে যেদিন শুধু আল্লাহই থাকবেন বিচারক এবং সেদিন ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি তার ক্ষতিপূরণ দাবি করবে। আল্লাহ তখন গীবতকারী ব্যক্তির ভালোকাজ থেকে তার ক্ষতিপূরণ দিয়ে দিবে।

আল্লাহর রাসূল বলেছেন,

“সুদের সত্তরটি স্তর আছে, এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট স্তরটি হলো মায়ের সাথে জিনা করা এবং সর্বোচ্চ খারাপটি হলো একজন মুসলমান তার মুসলিম ভাইয়ের সম্মানে আক্রমণ করা.” তিনি আরো বলেন, “যে তার ভাইয়ের সম্মান রক্ষা করে তার ভাই, আল্লাহ তাকে কেয়ামতের দিন দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবে. “(তিরমিযী)

তাই মুসলমানদের সম্মান নিয়ে কানাকানি করা ঠিক না।

আল্লাহ বলছেন,

“হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।.” (আল আহযাব ৩৩:৭০)

আল্লাহ বলছেন,

“আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি এবং তার মন নিভৃতে যে কুচিন্তা করে, সে সম্বন্ধেও আমি অবগত আছি। আমি তার গ্রীবাস্থিত ধমনী থেকেও অধিক নিকটবর্তী।যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে।সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্যে তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে।”(কৃাফ-৫০.১৬-১৮)

মুসলিম ভাইয়েরা, অন্যদের সম্পর্কে গল্প ও খারাপ ধরনের গীবত। এর মানে হলো লোকের থেকে পরের বহন বপন dissention তাদের মধ্যে অভিপ্রায় সঙ্গে অন্য যাও. আল্লাহ এই দলিল নিন্দিত যখন তিনি বলেন,

“যে অধিক শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, আপনি তার আনুগত্য করবেন না। যে পশ্চাতে নিন্দা করে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে ফিরে। “(আল কালাম ৬৮ঃ ১০-১১).

নবী (সাঃ) বলেন,

“গীবতকারী জান্নাতে. প্রবেশ করবে না”
মনের গীবতঃ
কারো ব্যক্তিগত ত্রুটি নিয়ে অন্য কারো সাথে কথা বলা যেমন নিষেধ তেমনি অন্যোর ত্রুটি নিয়ে নিজের সাথে কথা বলাও নিষেধ এবং খারাপ ধারণা ধরে রাখাও নিষেধ।

কুরাআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেনঃ ” হে বিশ্বাসীরা তোমরা অধিক সন্দেহ থেকে দূরে থাক। অবশ্যই কিছু সন্দেহ হচ্ছে পাপ”।
আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, রাসুল (সাঃ) বলেনঃ “সন্দেহ থেকে সাবধান হও, প্রকৃতপক্ষে সন্দেহ হচ্ছে সবচেয়ে বড় মিথ্যা”।
এগুলোর ব্যাখ্যায় বলা যায় মনের গীবত হচ্ছে সেটি কারো বিষয়ে যদি বদ্ধমূল ধারণা জণ্মে এবং ব্যক্তি যদি সেই ধারণাকে ধরে রাখে। তবে সেসব ধারনা মানুষের মনে আসে সেগুলো যদি কেউ ধরে না রাখে তাহলে গীবত হবেনা।

সুতরাং, আসুন আল্লাহকে ভয় করি।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যর অনুপস্থিতিতে তার সম্বন্ধে বলা জায়েজঃ

১) কোন মজলুম ব্যক্তির তার সাথে অত্যাচারের কথা বিচারক সামনে বা সেরকম কোন কর্তৃপক্ষের সামনে বলা জায়েজ।
২) কাউকে সংশোধনের উদ্দেশ্য অন্য কারো সাথে তার বিষয়ে কথা বলা জায়েজ।
৩) যারা সবার সামনে প্রতারনা করে, জুয়া খেলে, মদ খায়, এদের সমালোচনা করা জায়েজ।
৪) বিয়ের ক্ষেত্রে কেউ কারো বিষয়ে জানতে চাইলে তার বিষয়ে বলা জায়েজ।

লেখাটি ইমাম আল-মদিনা আল-মুনাওয়ারাহ
আলী আবদ-উর-রহমান আল-হুদাইফি এর একটি লেকচার থেকে অনুবাদ এবং মডিফাই করা হয়েছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s