আমার সংগঠন ভাবনা।

ছোট বেলা থেকে একটু লাজুক টাইপের ছিলাম। পাশে যেদিন ফুফুর বাসায় বেরাতে যেতাম, ফুফাতো ভাইয়ের টেবিলে চোখ চলে যেত। সাইমুম সিরিজ এর বই আর ইরান এর ম্যাগাজিন নিউজ লেটার বই হাতে চুপচাপ পড়া শুরু করতাম। সেই থেকে ইসলামী ব্যক্তিত্ব এবং ইসলামী কালচার এর বিষয়ে একটু আধটু আগ্রহ জন্মানো শুরু হলো। আমি আমার সেই ক্লাশ থ্রি-ফোর এর কথা বলছি। এরপর বড় হতে থাকলাম মসজিদে যাতায়াত আস্তে আস্তে বাড়তে থাকল। একটি ব্যাপার লক্ষ্য করলাম আমার মহল্লার কিছু ভাই শুত্রুবার বিকেলে বসে কি যেন আলোচনা করতেন। তবে আমাকে কেউ কখন ও ডাকেনি। ব্যাপারটি আমি তখন বুঝতেই পারিনি আর বুঝার ও চেষ্টা করিনি। ফ্যামিলি একটু ইসলামিক হওয়ার কারনে মসজিদে যাতায়াত এগুলো ছিলো। আমার আম্মা যখন ছোট তখন নানা, নানী আর আমার সেই ছোট আম্মু হজ্জ্ব করে এসেছিলেন, সেই ১৯৬০ সালের দিকে। যাহোক, যখন সাইমুম সিরিজ , দস্যু বনহুর , দস্যু পাঞ্জা, ক্রুসেড সিরিজ বইগুলো পড়তাম কেমন জানি বইয়ের চরিত্রগুলো নাড়া দিয়ে যেত। সাইমুম এর আহমাদ মুসা ব্যাপক নাড়া দিলো। এভাবে স্কুল , কলেজ শেষ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। হলে উঠতে গিয়ে ও উঠা হলোনা আমার বন্ধুর বড় ভাইয়ের কারনে। উনি বললেন যে না হলে থাকা লাগবে না, তোমরা মেস এ চলো। ভাগ্য ভালো ই বলতে হবে, আমরা ক্লাশ শুরু করার একমাস পর ২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভয়াবহ মারামারি শুরু হলো। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন স্টেশন বাজার আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হলো। যাহোক হলে না উঠার উপকারীতা একটু উপলব্ধি করলাম। উঠেছিলাম মির্জাপুর মসজিদ এর ছাত্রাবাসে। মসজিদ আর ছা্ত্রাবাস একেবারে লাগানো। মসজিদে ইকামাত দিলে রুম থেকে শোনা যেত। এক অলস ভাই ছিলেন উনি আবার মাঝে মাঝে নিজের রুম থেকে মসজিদের সাথে জামায়াত বদ্ধ হয়ে নামাজ আদায় করতেন। মসজিদে নামাজ যারা পড়তে আসতেন উনারা বেশির ভাগ ই ছিলেন আবার বাংলাদেশ আহলে হাদীস এর লোক, আমাদের ছা্ত্রাবাস এর নাম ছিলো “ছালাফিয়া ছাত্রাবাস”। মসজিদের মসজিদের ঈমাম ও মুয়াজ্জিন আমাদের মেস এ থাকতেন। মাঝে মাঝে উনাদের সাথে ইসলামিক বিষয়ে আলোচনা হত। উনারা শুধু বিদয়াত বিদয়াত বলতেন, এসব দেখে বুখারী শরীফের ২ খন্ড কিনে নিয়ে আসলাম উনাদের সাথে তর্ক করার জন্য। এই তর্ক ই আমার জীবনের জন্য ভালো হয়ে দাড়ালো। সেখান থেকে মুলত ইসলামের বেসিক খুটিনাটি বিষয়গুলো এবং কুরআন ভালো ভাবে শেখা শুরু হলো।
৩ বছর পর হলে সিট পেলাম , সৈয়দ আমীর আলি ৩৪৫ নং রুম এ সিট হলো। রুমে ইসলামী ছাত্রশিবিরের ব্লক সভাপতি আর একজন সাবেক সদস্য ভাই, আর এক সিট আর একজন ছিলো। যাহোক হল এর জীবন শুরু সাথে সাথে নিজের অজান্তেই শুরু হলো সংসঠনের সাথে পথ চলা। আমি রোজ ফজরের নামাজে ডেকে দিতাম শিবিরের দুভাইকে , আমি নিজে আগে থেকে নিয়মিত নামাজ কুরআন পড়তাম। এশার নামাজ পড়ে দেখতাম কিছু ছেলে বসে কি যেন আলোচনা করে। একদিন বসার জন্য ডাক পেলাম, মসজিদের ভেতরে বসলাম। তারপর নিয়মিত বসতে বলত খারাপ লাগত না। আমিও বসতাম। দেখতাম একটু বসার পর বলা হতো, কর্মী ভাইয়েরা চলে যান, সাথী ভাইয়েরা বসেন। আমি আবার ভাবতাম এটা আবার কেমন হলো আমাকে উঠতে হলো আমার চেয়ে জুনিয়র ছেলেরা বসে আছে এতো লজ্জার কথা। ইতোমধ্যে একটি ব্যক্তিগত রিপোর্ট বই ও টেবিলে হাজির হলো। বইয়ের ঘরগুলো খারাপ ছিলোনা রেখে দিলাম। একদিন জিজ্ঞেস করলাম সাথী হলে কি করতে হবে? জানতে পারলাম কিছু ইসলামিক বই পড়তে হবে আর নামাজ, কুরান নিয়মিত পড়তে হবে। যাহোক আমি এমনিতে বই পড়তে ভালোবাসতাম। আর নামাজ ও কুরআন আগে থেকে ই পড়তাম সুতরাং বেশি সময় নিলাম ওখানে বসার যোগ্যতা অর্জন করতে। আমি জেনারেল লাইন এর ছাত্র হলে আরবি লিখতে ও পড়তে পারতাম আর তাই আরবিতে হাদিস গুলো খুব দ্রুত মুখস্ত হয়ে গেলো। তবে বই গুলো পড়তে গিয়ে মূলত ইসলামিক জীবন ব্যবস্থার একটি মুটামুটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করলাম। বই পড়তাম আর সংগঠনের সাথে মিলাতাম আর কোন ব্যতিক্রম দেখলেই অভিযোগ করতাম। এভাবে চলছিল আমার সাংগাঠনিক জীবন। সদস্য হওয়ার টার্গেট নিলাম পড়াশুরু করলাম। ও একটি কথা বলে রাখা ভালো আমি কিন্তু একটি ভালো সাবজেক্টে পড়তাম। হঠাৎ একটি অঘটন ঘটলো তখনকার বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি জেলে চলে গেলেন। দায়িত্বপেলেন বক্তৃতায় ভালো পারদর্শী আর একজন। যাহোক ইতোমধ্যে আর ও একটি দূর্ঘটনা ঘটল, যেটার কারনে আমি খুব ই আপসেট হয়ে পরলাম, এবং কিছুটা সাংগাঠনিক কাজ কমিয়ে দিয়ে, সদস্য হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখে পড়ালেখায় মনযোগ দিলাম। এবং আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো ফল ও পেয়েছি।

আমার সাংগাঠনিক ভাবনার প্রারম্ভিক কিছু আলোচনা করলাম। আসল আলোচনা এখন শুরু করব। ইনশাল্লাহ।

আমি যেদিন থেকে ইসলামী বই পড়া শুরু করলাম, যেদিন থেকে ইসলামের প্রারম্ভিক কালের মুসলিমদের জীবনী জানা শুরু করলাম এবং যেদিন থেকে ইসলামী একটি সংগঠনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হলাম, সেদিন থেকে একটি সমীকরণ মিলানোর চেষ্টা করেছি। আর সেটা হলো

কুরআন + হাদীস = ইসলামের বিজয়।

যেখানে ব্যতিক্রম দেখেছি অভিযোগ করেছি। কিন্তু আমার কাছে একটি জিনিস মনে হয়েছে। হয়ত আমার ভূল ও হতে পারে আর তা হলো যারা ইসলামিক সংগঠন করেন তাদের বেশির ভাগের মধ্যে ইসলাম এর সঠিক বুঝ এর অভাব আছে। বেশির ভাগ ই না বুঝে আবেগ দিয়ে সংগঠন করে। আর আবেগ দিয়ে সংগঠন করতে গিয়ে সাংগাঠনিক আনুগত্য হয়ত ঠিক ই হয় কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে ই আল্লাহর আনুগত্য থেকে বিচ্যুতি ঘটে। আর এই বিচ্যুতি জেনারেশন টু জেনারেশন চলার কারনে এখন একটু বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে আর হওয়াটাই ইসলাম তথা সবার জন্য ভালো। তার আগে একটি কথা বলে নেই। যারা সংগঠনের গঠনমুলক সমালোচনা কে সংগঠন বিরোধী মনে করেন তাদের বলব আবেগ টা একটু কমিয়ে দিতে। কেউ যদি আল্লার পথে সঠিক নিয়ত নিয়ে চলে তার লজ্জার কি আছে আর ভয় বা কি?? আমার লক্ষই ই যদি হবে জীবনেদ্দেশ্য তাহলে টাকা পয়সা আর সামাজিক প্রতিপত্তির উপর এতো আগ্রহ কেন? অবশ্যই আগ্রহ থাকতে হবে, তবে আগ্রহটা যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উপরে স্থান পায় তাহলে সমস্যা। সমস্যা হলো তখন ই শরীয়তের বরখেলাফ হয়, তখনি মানুষ বিচ্যুত হয়, বিচ্যুতি ঘটে।

দ্বীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠার যে ত্যাগ সে ত্যাগ হয়ত অনেকেই করছে, তাদের সালাম জানাই। কিন্তু শহীদ শহীদ বলে সেসব শহীদের রক্তের উপর দাড়িয়ে যে সংগঠন, যে সংগঠনের হুংকারে আজ বাংলার মাটি কাপার কথা সেখানে আজ দুর থেকে দৃশ্যমান এক প্রদীপ ই মনে হয়। কারন আমার সংগঠন ভাবনা অনুযায়ী এসব দিয়ে সঠিক দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা সম্ভব না। কৌশলের নামে যদি মিথ্যার সাথে আপোষ করতে হয় সেখানে সত্যের গায়ে কিছুটা কালিমা লেগে ই যায়। আজ অনেকেই আজ ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। কারন সামাজিক ভাবে প্রতিপত্তি অর্জন না হলে নাকি ইসলাম প্রতিষ্ঠা হবে না। মনেহয় ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর কাছ থেকে টেন্ডার কিনেছে।

যে ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে ত্যাগ আর ভালোবাসার মাধ্যমে সেখানে ক্ষমতা আর প্রতিপত্তি দিয়ে নতুন করে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব না। সম্ভব তখনি যখন ইসলামের রঙ্গে রঙ্গিন হয়ে মানুষের দুয়ারে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যাওয়া হবে ভালোবাসা আর ত্যাগের এক অপূর্ব নিদর্শন হয়ে। মনের মধ্যে ভোগের বাসনা রেখে কখন ই মানুষের ভালোবাসা আদায় সম্ভব না।

আমি সেই সংগঠনের স্বপ্ন দেখি যেটি ইসলামের রঙ্গে রঙ্গিন। যার কর্মী বাহিনীর মাঝে ইসলামী মুভমেন্ট এবং পলিটিক্স এর পার্থক্যের সম্যক ধারণা থাকবে। যাদের মাঝে ভোগ আর বিলাসিতার পরিবর্তে ত্যাগ আর ভালোবাসা স্থান লাভ করবে। যারা সবক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিতে পারবে। কোন পার্থিব বিষয়কে নয়।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s